ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে, সমর্থন নেমে এল ৩৪ শতাংশে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
 ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে, সমর্থন নেমে এল ৩৪ শতাংশে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে বসার পর এক বছরের মাথায় এসে তীব্র জনপ্রিয়তার সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স ও ইপসোসের যৌথভাবে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, বর্তমানে মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করছেন। এই হার তাঁর চলতি মেয়াদে তো বটেই, এমনকি আগের মেয়াদেরও প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মূলত জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর ট্রাম্পের নেওয়া বিতর্কিত অবস্থানের কারণেই সাধারণ জনগণের মধ্যে এই চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী এই জরিপের ফলাফল ট্রাম্প শিবিরের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর প্রতি জনসমর্থন ছিল ৪৭ শতাংশ। কিন্তু মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানেই সেই সমর্থনের পারদ দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেছে।

বিস্ময়কর তথ্য হলো, ট্রাম্পের ২০১৭-২০২১ মেয়াদে জনপ্রিয়তার সর্বনিম্ন হার ছিল ৩৩ শতাংশ। বর্তমান পরিস্থিতি সেই রেকর্ড ভাঙার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর বর্তমান রেটিং মাত্র ২৭ শতাংশ, যা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম খারাপ সময় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস নামার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস দূর করা। কিন্তু বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মার্কিন পাম্পগুলোতে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি গ্যালন ৪.১৮ ডলারে পৌঁছেছে। 

এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় সন্তুষ্ট মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পথ বেছে নেওয়াকে মার্কিন ভোটারদের বড় একটি অংশ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং তার ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

অনেক ভোটারই মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সংস্কারের চেয়ে বিদেশের মাটিতে ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াটা বর্তমান প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

গত শনিবার রাতে ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলে 'হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন'-এর বার্ষিক নৈশভোজ চলাকালীন এক বন্দুকধারী গুলি চালান। 

ফেডারেল প্রসিকিউটরদের মতে, এটি ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার একটি প্রচেষ্টা। যদিও হামলাকারীকে দ্রুত আটক করা হয়েছে এবং ট্রাম্প সুরক্ষিত আছেন, তবে এই ঘটনা জনমতে কোনো সহানুভূতি তৈরি করতে পেরেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ রয়টার্স/ইপসোসের জরিপের অধিকাংশ উত্তরদাতাই এই ঘটনার আগে তাদের মতামত প্রদান করেছিলেন।

ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও অস্বস্তি বাড়ছে। যদিও দলীয় কর্মীদের ৭৮ শতাংশ এখনো ট্রাম্পের পাশে আছেন, কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো—দলের ৪১ শতাংশ সমর্থকই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ব্যর্থতায় অসন্তুষ্ট।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করবেন মূলত 'স্বতন্ত্র' বা নির্দলীয় ভোটাররা। আর সেখানেই বড় বিপদে আছে রিপাবলিকানরা। 

স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের এই ১৪ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা রিপাবলিকানদের জন্য নভেম্বর মাসে একটি বড় পরাজয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করে এসেছেন যে তাঁর সময়ে মার্কিন অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কিন্তু রয়টার্স/ইপসোসের ডাটা বলছে ভিন্ন কথা। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে তাঁর পদক্ষেপগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অকার্যকর বলে মনে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ভোটাররা মনে করছেন, ট্রাম্পের নীতিগুলো ধনকুবেরদের সুবিধা দিলেও সাধারণ ক্রেতাদের পকেট খালি করছে।

রয়টার্স ও ইপসোসের এই জরিপটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মোট ১ হাজার ২৬৯ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন ছিলেন নিবন্ধিত ভোটার। এই জরিপের ফলাফল মার্কিন রাজনীতির বর্তমান মেরুকরণ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি বাড়তে থাকা অনাস্থার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন একটি কঠিন পরীক্ষার মুখে। একদিকে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি, এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলায় তিনি যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারেন, তবে তাঁর জনপ্রিয়তা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। 

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই ৩৪ শতাংশ সমর্থনের হার রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ হারানোর পথ প্রশস্ত করতে পারে। হোয়াইট হাউসের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গুলি এবং যুদ্ধের উত্তাপ সরিয়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজারের দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তা নিশ্চিত করা।

এএন