ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখানের পর ইরানের নতুন মারণাস্ত্রের হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখানের পর ইরানের নতুন মারণাস্ত্রের হুঁশিয়ারি
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে তিনি ইরানের হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তেজনা এখন ফুটন্ত কড়াইয়ের মতো টগবগ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব, যা মূলত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের একটি পরিকল্পনা ছিল- তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার পর পরিস্থিতি এক ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কেবল হুঁশিয়ারিই দেয়নি, বরং দাবি করেছে যে তারা এমন এক নতুন মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে যাচ্ছে, যা দেখলে শত্রুপক্ষের ‘হার্ট অ্যাটাক’ হতে পারে।

ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল শাহরাম ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম 'প্রেস টিভি'-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই রহস্যময় অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র খুব শীঘ্রই শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হবে এমন একটি অস্ত্র নিয়ে, যা তারা গভীরভাবে ভয় পায়।

তিনি বিদ্রূপ করে বলেন, অস্ত্রটি এখন ঠিক তাদের পাশেই রয়েছে... আমি আশা করি এটি দেখে তাদের হার্ট অ্যাটাক হবে না।

কমান্ডার ইরানি ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশলকে উপহাস করে বলেন, ওয়াশিংটন ভেবেছিল অর্থনৈতিক অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল বাণিজ্য বন্ধ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে। কিন্তু তাদের সেই ধারণা এখন সামরিক একাডেমিগুলোতে একটি ‘কৌতুক’ বা হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে।

এই সাক্ষাৎকারে কমান্ডার শাহরাম ইরানি একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন। তিনি জানান, ইরানি বাহিনী মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এর ওপর অন্তত ‘সাতটি সফল ক্ষেপণাস্ত্র অভিযান‘চালিয়েছে।

এই অভিযানের ফলে মার্কিন নৌবাহিনী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই রণতরি থেকে কোনো বিমান উড়াতে বা বিমান অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হয়নি। যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে এটি পারস্য উপসাগরে মার্কিন আধিপত্যের ওপর একটি বড় আঘাত হিসেবে গণ্য হবে।

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তেহরান এ পর্যন্ত অন্তত ১০০টি সফল পাল্টা হামলার ‘ঢেউ’ (Waves of Reprisal) পরিচালনা করেছে। এই হামলাগুলো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংবেদনশীল মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ: বিশ্বের ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী এই জলপথটি এখন কেবল ইরানের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যবহারের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। শত্রুভাবাপন্ন কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না।

আরব সাগর থেকে নিয়ন্ত্রণ: ইরান জানিয়েছে তারা আরব সাগর থেকেই হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়েছে। মার্কিন বা ইসরায়েলি জাহাজ আরও কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে কোনো বিলম্ব ছাড়াই সরাসরি ‘অপারেশনাল অ্যাকশন’ নেওয়া হবে।

নৌ-অবরোধ ভেদ: মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও ইরান দাবি করেছে যে, তাদের কিছু জাহাজ সফলভাবে বন্দর ছেড়েছে এবং গন্তব্যে পৌঁছেছে।

কমান্ডার শাহরাম ইরানি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘জলদস্যুতা’ এবং ‘জিম্মি করার’ গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী অবৈধভাবে ইরানি জাহাজ জব্দ করছে এবং নাবিক ও তাদের পরিবারগুলোকে জাহাজের ওপর জিম্মি করে রাখছে।

তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, আমেরিকানরা সোমালি জলদস্যুদের চেয়েও জঘন্য। কারণ সোমালিরা দারিদ্র্যের কারণে দস্যুতা করত, কিন্তু মার্কিনিরা তাদের নৃশংসতার সাথে ‘জিম্মি করার’ নোংরামি যোগ করেছে।

তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন যে, যুদ্ধে নিহত প্রত্যেকটি প্রাণের প্রতিশোধ ইরান তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে নেবে এবং শত্রুকে এমন এক আঘাত হানবে যা তারা চিরকাল অনুতাপের সাথে স্মরণ করবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি কেন ইরানের প্রস্তাব নাকচ করেছেন। ইরানের প্রস্তাবটি ছিল মূলত একটি 'সময় কেনার' কৌশল। এতে বলা হয়েছিল, 

মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করলে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী কোনো সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হবে।

ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, বোমা হামলার চেয়ে এই নৌ-অবরোধ অনেক বেশি কার্যকর। এটি ইরানের জন্য আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।

ট্রাম্পের মতে, এই যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখা। আলোচনা স্থগিত করার অর্থ হলো ইরানকে গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির সুযোগ দেওয়া, যা ট্রাম্প প্রশাসন কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থান এবং ইরানের ‘হার্ট অ্যাটাক’ সৃষ্টিকারী অস্ত্রের হুমকির ফলে এটি পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এখন সুদূরপরাহত। একদিকে তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মতো রণতরিগুলো আক্রান্ত হচ্ছে।

ইরান যখন তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ার শপথ নিচ্ছে এবং ট্রাম্প যখন অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে ‘শ্বাসরোধ’ করতে চাইছেন, তখন মাঝপথে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য এই যুদ্ধ কেবল ধ্বংস আর হাহাকার বয়ে আনছে। 

মে মাসের সময়সীমা এবং বিজয় দিবসের প্রস্তাবিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি কি শেষ পর্যন্ত কোনো আলোর মুখ দেখাবে, নাকি নতুন কোনো রহস্যময় মারণাস্ত্রের আঘাতে পারস্য উপসাগর আবার রক্তাক্ত হবে, তার উত্তর মিলবে খুব শীঘ্রই।

এএন