বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক

‘পুশইন’ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে চায় না ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ১০:২২ এএম
‘পুশইন’ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে চায় না ভারত

তথাকথিত ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের’ বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ বা একতরফা ঠেলে পাঠানো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ের মহাপরিচালক (ডিজি) স্তরের বৈঠকে অংশ নিতে ১৪ সদস্যের একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছেছে। বহুল আলোচিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘পুশ ইন’ ইস্যুটি জোরালোভাবে তোলার কথা বলা হলেও ভারতের তরফ থেকে তাদের আলোচনার মূল অ্যাজেন্ডায় বিষয়টি রাখা হয়নি।

ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার বিশেষ খবরে বলা হয়েছে, চার দিনব্যাপী এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের অফিশিয়াল অ্যাজেন্ডায় ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিতর্কিত পুশ ইন নীতির বিষয়টি উল্লেখ করেনি। অথচ গত রবিবার ঢাকা স্পষ্ট জানিয়েছিল, ভারতের পুশ ইন এবং সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। ফলে বিএসএফের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বিষয়টি আমলে নিলে এটি পরিষ্কার যে ভারত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা করতে আগ্রহী নয়।

এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জানিয়েছে, সীমান্ত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে মাঠপর্যায়ে আরও ভালো সমন্বয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিএসএফের সেই বিবৃতি অনুযায়ী, আলোচনায় মূলত বাংলাদেশি নাগরিকদের হাতে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর কথিত হামলা প্রতিরোধ, আন্তসীমান্ত অপরাধ দমন, বাংলাদেশি অপরাধীদের অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্বারা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া লঙ্ঘনের বিষয়গুলোই বেশি প্রাধান্য পাবে।

এ ছাড়া সীমান্তে যৌথ বেড়া নির্মাণ, বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সীমান্ত অবকাঠামো সংক্রান্ত কারিগরি বিষয়গুলোও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে বিএসএফের পুরো বিবৃতির কোথাও ‘পুশ ইন’ শব্দটির কোনো উল্লেখ করা হয়নি।

চার দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।

তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত, আটক ও বহিষ্কারের লক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘ডিটেক্ট-ডিটেইন-ডিপোর্ট’ বা ‘শনাক্ত-আটক-বহিষ্কার’ নীতির আওতায় কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত বা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ না করেই দ্রুত বাংলাদেশে পুশ ইন করার অভিযোগ রয়েছে। এই অমানবিক বিষয়টি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ভারতের এই একতরফা পুশ ইন নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক কড়া প্রতিবাদও জানিয়েছে। একই সঙ্গে এই পদক্ষেপকে ঘিরে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রকৃত ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।

গত মাসে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লিকে কড়া বার্তা দিয়ে জানায়, কোনো ধরনের জোরপূর্বক ও একতরফা প্রত্যাবাসন সরাসরি আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশ আরও মনে করিয়ে দেয়, যেকোনো ধরনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পন্ন হতে হবে।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত রবিবার ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে ভারতের পক্ষ থেকে অবৈধ পুশ ইনের বিষয়টি বিজিবির পক্ষ থেকে এবার বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত বছর থেকে বিএসএফ বিপুলসংখ্যক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অবৈধভাবে পুশ ইন করেছে। বিশেষ করে ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্য আসাম, দিল্লি, গুজরাট, ওডিশা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র থেকে এসব হিন্দিভাষী মানুষকে ট্রাকে করে এনে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত আন্তর্জাতিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিপরীতে এই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধও পাঠানো হচ্ছিল না। একইভাবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাসপোর্ট না থাকলে তাদের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাভেল পারমিট বা ভ্রমণ অনুমতিপত্র ইস্যুর আইনি প্রক্রিয়াও পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত।

এএন