গত বছরের জুলাই আন্দোলন দমনে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করে পুলিশ বাহিনী। তখন বাহিনীর প্রধান ছিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। জুলাই গণহত্যার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত হলেও বর্তমানে রাজসাক্ষী হয়ে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছেন।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেলে জবানবন্দি দেন সাবেক আইজিপি মামুন।
তিনি জুলাই আন্দোলন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
মামুন বলেন, “২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতে ৫০ শতাংশ ভোট ব্যালট বাক্সে ভরে রাখতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী।” এছাড়া পুলিশে তথাকথিত ‘গোপালগঞ্জ সিন্ডিকেট’ নিয়েও বিস্তারিত জানান তিনি।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো ও ব্লক রেইডের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে নেয়া হয়েছিল। “লেথাল উইপেন ব্যবহারের নির্দেশনা এসেছিল শেখ হাসিনার কাছ থেকে। আর সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব ও ডিবি প্রধান হারুন ছিলেন এতে অতিউৎসাহী।”
তিনি আরও জানান, র্যাব-১ এ টিআইএফ নামে গোপন বন্দিশালা ছিল, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক রাখা হতো। অনুরূপ বন্দিশালা অন্য ইউনিটেও ছিল। এসব নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেই আসত, কখনও তারেক সিদ্দিকীর মাধ্যমে। আটক ও ক্রসফায়ার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন র্যাবের নির্দিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০১৮ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব আরও বেড়ে যায় বলে দাবি করেন মামুন। কিছু কর্মকর্তা সরাসরি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। প্রায় রাতেই তারা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় বৈঠক করতেন, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলত। এসব বৈঠকে অংশ নিতেন সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবি প্রধান হারুনুর রশীদ, এসবি’র মনিরুল ইসলাম, ঢাকার ডিআইজি নুরুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি বিপ্লব কুমার, এএসপি কাফী, ওসি মাজহার, ফোরকান অপূর্বসহ অনেকে। তাদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে শেখ হাসিনারও সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
রাজসাক্ষী মামুন বলেন, এসব প্রভাবশালী কর্মকর্তা চেইন অব কমান্ড মানতেন না। তারা মূলত দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করতেন, যারা চেয়েছিলেন নিজেদের বলয়ের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে।
সমন্বয়কদের আটক ও নির্যাতনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের নির্দেশেই তাদের আটক করে মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হয়।
এ বছরের ২৪ মার্চ চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি জানান, আসামি থেকে রাজসাক্ষী হয়ে সত্য প্রকাশ করতে চান।
এর আগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে আহত, শহীদ পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসকসহ ৩৫ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশনের আশা, চলতি মাসেই এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন