আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা সিভিল ওয়ার (গৃহযুদ্ধ) লাগানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি সেনাবাহিনীকে উসকে দিয়ে বলেন, “তোমাদের অফিসারদের বিচার হয়, তোমরা কেন রুখে দাঁড়াচ্ছ না?” কিন্তু বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সেই ফাঁদে পা দেয়নি।
তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে উসকে দিতে চেয়েছিলেন, যাতে রাষ্ট্রীয় স্থিতি নষ্ট হয় এবং বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে চলমান মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে তাজুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
মামলার অপর দুই আসামি হলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
তিন আসামির বিরুদ্ধেই ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সহিংসতা, হত্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়।
আইজিপি মামুন ইতিমধ্যেই নিজের দোষ স্বীকার করে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আগামী ১৩ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আদালতে বলেন, ‘শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান তাদের অপরাধ সম্পর্কে অবগত থাকলেও কখনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। দুনিয়ার সবাই জানে, এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তারাও জানেন। কিন্তু কোনো রকম অনুতাপ নেই। বরং যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের হত্যা করার হুমকি দিচ্ছেন। বলছেন, তাদের লাশ বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৩৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, বহু নারী, শিশু ও ছাত্র নিহত হয়েছেন। এত কিছু ঘটার পরও তার (শেখ হাসিনা) মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখা যায়নি। এমন অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ছাড়া অন্য কোনো শাস্তি যথাযথ নয়।’
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা দেশের প্রধান নিরাপত্তা বাহিনীকে সরাসরি উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি সেনাবাহিনীকে বলেছেন, ‘তোমাদের অফিসারদের বিচার হয়, তোমরা কেন চুপ করে আছ?’ এভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রে বিভক্তি সৃষ্টি করে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
তবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সেই প্ররোচনায় পা দেয়নি। জনগণও সেই ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়নি। তারা বিচারের পক্ষে, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।’
প্রসিকিউশন পক্ষের দাবি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংঘটিত সহিংসতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড কেবল রাজনৈতিক নয়, তা ছিল রাষ্ট্রবিনাশী ষড়যন্ত্র।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পরপরই দেশে ব্যাপক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনা ধ্বংস ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তদন্তে দেখা যায়, এই সহিংসতার পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উসকানিমূলক ভাষণ ও গোপন নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তদন্ত সংস্থা বলছে, ৫ আগস্টের পর তিন দিনের মধ্যে প্রায় ১৭টি জেলা প্রশাসন অফিস, পুলিশ স্টেশন, সরকারি ভবন ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা হয়।
তাজুল ইসলাম যুক্তিতর্কে বলেন, ‘যে অপরাধে নারী, শিশু, শ্রমিক ও ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে, সেই অপরাধের দায় কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের শত্রুরা চেয়েছিল দেশের বিচারব্যবস্থাকে অচল করতে, জনগণের আস্থা নষ্ট করতে। শেখ হাসিনা সেই প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
তিনি দাবি করেন, বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লবি নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ও আইনজীবীরা বিচারের পক্ষে দৃঢ় থেকেছেন।
আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনজীবীরা বলেন, মামলাটি এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিচারপ্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে। প্রসিকিউটরের বক্তব্যের সময় আদালত কক্ষে উপস্থিত ছিলেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও।
প্রসিকিউটরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনার আইনজীবী দলের একজন বলেন, ‘এটি রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত মামলা। উসকানির অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষ নয়।’
তবে ট্রাইব্যুনাল আজ যুক্তিতর্ক গ্রহণ করে রায় কবে জানা যাবে তারিখ ১৩ নভেম্বর নির্ধারণ করেছে।
চিফ প্রসিকিউটরের এই বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা বলছেন, শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট উদাহরণ, আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুবুল হক বলেন, ‘এই মামলার ফলাফল কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। যদি আদালত স্পষ্ট রায় দেন, তাহলে তা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নৈতিক সীমারেখা তৈরি করবে।’
তাজুল ইসলাম তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনের চেষ্টা করা হলেও বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে। আদালতের কার্যক্রম কোনো বাধা ছাড়াই এগোচ্ছে। দেশের জনগণ ন্যায়বিচার চায় এবং সেই বিচার নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কোনো উসকানিতে সেনাবাহিনী বা জনগণ জড়ায়নি। বিচারের প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে চলছে।
এ মামলার রায় কবে হবে, তা জানা যাবে আগামী ১৩ নভেম্বর। ট্রাইব্যুনাল সূত্র বলছে, রায় ঘোষণার দিন নিরাপত্তা জোরদার করা হবে এবং আদালতের চারপাশে থাকবে র্যাব, পুলিশ ও সেনা সদস্যদের কড়া নজরদারি।
একজন আইন পর্যবেক্ষক বলেন, এই রায় বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। কারণ এটি কেবল ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও আইনের শাসনের প্রতীক হিসেবে দেখা হবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনের চেষ্টা, সেনাবাহিনীকে উসকানি, এবং গণ–অভ্যুত্থানের পটভূমি সব মিলিয়ে এই মামলার ফলাফল দেশীয় রাজনীতির গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রসিকিউটরের দাবি যতই কঠোর হোক, শেষ কথা বলবে আদালত। তবে আজকের শুনানি স্পষ্ট করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের ধারাবাহিকতা থেমে নেই। রাষ্ট্রবিরোধী কোনো উসকানিই জনগণের ঐক্য ও সেনাবাহিনীর সংযম ভাঙতে পারেনি। বাংলাদেশ এগোচ্ছে আইন ও ন্যায়বিচারের পথে।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়েছে দেশের অন্যতম আলোচিত মামলার যুক্তিতর্ক।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন