পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্পে সরকারি জমি বরাদ্দে বিধি লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা বহুল আলোচিত দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৭ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত। আগামী ২৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত–৫ এ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।
রোববার দুপুরে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন উভয়পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য এ দিন ঠিক করেন। বহুল আলোচিত মামলাটির সর্বশেষ শুনানিতে আদালত ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তরও উঠে আসে, যা এদিন আদালতকক্ষে উল্লেখযোগ্য আলোচনার জন্ম দেয়।
মামলার ৪৭ আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার রয়েছেন কেবল রাজউকের সাবেক কর্মকর্তা খুরশিদ আলম। তাঁর আইনজীবী যুক্তিতর্কে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি তা বাস্তবায়নে বাধ্য ছিলেন। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ভূমি বরাদ্দ করা হয়নি।
প্রশ্নটির পর আদালতকক্ষে কিছু মুহূর্তের নীরবতা নেমে আসে। এরপর আসামিপক্ষ আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করলেও আদালত জানিয়ে দেন সরকারি চাকরির দায়বদ্ধতা ও অবৈধ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার বিষয় দুটি এক নয়।
সকালে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের উপস্থাপনায় অভিযোগ তুলে ধরে জানায়, পরিকল্পিতভাবে পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্প থেকে ৩০ কাঠা সরকারি জমি প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের দখলে নেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা তিনটি মামলার প্রতিটিতেই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা, ব্রিটিশ সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিকসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি এটি ছিল সরকারি সম্পদ অবৈধভাবে দখল করার সমন্বিত প্রক্রিয়া, আর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষমতার অপব্যবহারের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব হয়েছিল। মামলার নথি উপস্থাপন করে তারা জানায়, টেন্ডার, নীতিমালা ও প্রকল্প অনুমোদন সব জায়গাতেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষ দাবি করেছে, অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের যুক্তি আদালতকে বিভ্রান্ত করতে কিছু কাগজপত্র ও সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং অন্য আসামিদের ভূমিকা ছিল প্রকল্পের নীতি পর্যায়ে, কিন্তু সরাসরি জমি বরাদ্দে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রাষ্ট্রপক্ষ দেখাতে পারেনি।
এদিন শুধু একটি আদালতেই ছিল না ব্যস্ততা। ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালতেও অনুষ্ঠিত হয় এ মামলার আরেক সংস্করণের শুনানি। সেখানে শেখ রেহানা, শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিকসহ মোট ১৭ আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য শোনেন আদালত।
আসামিপক্ষ সেখানে জানায়, প্রকল্পের বহু সিদ্ধান্ত ছিল প্রশাসনিক ও কারিগরি পর্যায়ের। উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিদের নামে দায় চাপিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে দুদক।
আদালত অবশ্য উভয় পক্ষের বক্তব্য নথিভুক্ত করে আগামী ধার্য তারিখে পরবর্তী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অন্যতম বৃহত্তম সম্প্রসারণ পরিকল্পনা। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের বিভিন্ন ব্লকের প্লট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম, যোগসাজশ এবং প্রভাব খাটানোর ঘটনা ঘটে।
দুদক তদন্তে উঠে আসে যে, সরকারি নীতিনালা উপেক্ষা করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অনুকূলে রাখতে দলিল, অনুমোদন ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল।
তদন্ত শেষে তিনটি পৃথক মামলায় মোট ৪৭ জনকে আসামি করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর পর দীর্ঘ শুনানি শেষে এসে এখন রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে মামলাটি।
দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম থাকায় শুরু থেকেই মামলাটি দেশের ভেতরে-বাইরে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আদালত এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা আগের চেয়ে আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় আদালত কঠোর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ছবি সরানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে যা এ মামলার সংবেদনশীলতা আরও স্পষ্ট করে।
রায়ের আগে জনমত ও রাজনৈতিক উত্তাপ
২৭ নভেম্বরের রায়কে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার ঝড় বইছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা যেকোনো মামলার রায় বরাবরই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সমর্থকরা বলছে, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা; বিপরীতপক্ষের দাবি, মামলার তদন্ত স্বচ্ছ হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিজস্ব গতিতেই এগিয়েছে।
রায়ের দিন ঘনিয়ে আসায় দুটি পক্ষেরই নজর এখন আদালতের ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের দিকে।
দীর্ঘ তদন্ত, শুনানি ও যুক্তিতর্কের শেষে এখন সব অপেক্ষা ২৭ নভেম্বরকে ঘিরে।
সেদিন বিশেষ জজ আদালত-৫ যে রায় দেবে, তা শুধু আসামিদের ভাগ্যই নির্ধারণ করবে না পূর্বাচল প্রকল্প নিয়ে বহুদিনের বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্নগুলোতেও এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠবে।
ইএইচ/জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন