ঢাকা–১৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এবং গুম–নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের হয়েছে।
বুধবার রাজধানীর একটি আদালতে মামলাটি করার মধ্য দিয়ে তুলিকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে এ ঘটনা।
পুরান ঢাকার তরুণ ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হোসাইন মোহাম্মদ আনোয়ার ব্যক্তিগতভাবে মামলাটি দায়ের করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান অভিযোগের বিবরণ শুনে মামলাটি গ্রহণ করেন এবং তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। একই সঙ্গে আদালত দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, দণ্ডবিধির ২৯৫(ক) ধারায় এই মামলা করা হয়েছে, যা ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।
আইনজীবী মাহমুদুল হাসান জানান, ইসলামে বিয়ের বিষয়ে তুলি যে মন্তব্য করেছেন, তা মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি–নীতির প্রতি অবমাননাকর। তার ভাষ্যমতে, মুসলিম পার্সোনাল ল’ ও কোরআনের নির্ধারিত বিধানে একজন মুসলিম পুরুষ চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে—এ বাস্তবতা নিয়ে তুলি 'অবজ্ঞাসূচক ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য' করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বিয়ের বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও তুলি এমনভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এবং তা মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, বিবাহ, তালাক, ভরণপোষণসহ পারিবারিক বিষয়ে মুসলিম পার্সোনাল ল’ (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট ১৯৩৭–এর বিধান সুস্পষ্ট হলেও তুলি প্রকাশ্যে এসব বিষয় অস্বীকার বা বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির একজন জনপ্রিয় মুখ ও মানবাধিকার ইস্যুতে আলোচিত নেতা তুলির বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা দলটিকে নতুন রাজনৈতিক চাপে ফেলতে পারে। কারণ, 'মায়ের ডাক' সংগঠনের মুখপাত্র হিসেবে গুম–নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর বক্তব্য তুলে ধরায় তুলি গত কয়েক বছরে আলোচিত হয়ে উঠেছেন। ভোটের আগে তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়াকে অনেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি সংবেদনশীল ঘটনায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন।
তবে বাদীপক্ষ দাবি করছে, মামলাটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দায়ের করা হয়েছে; এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। বাদী হোসাইন মোহাম্মদ আনোয়ার তার জবানবন্দিতে জানান, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি কোনও ধরনের অবমাননা সহ্য করা যায় না, তাই আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামের মৌলিক বিধানসমূহ জনসমক্ষে উপহাস বা বিকৃত করা হলে তা ধর্মীয় অধিকারের লঙ্ঘন। তার ভাষায়, 'তুলি ধর্মের রীতিনীতিকে হেয় করেছেন, যা সাধারণ মুসলমানের বিশ্বাসে আঘাত করে।
আদালতের নির্দেশ পেয়ে পিবিআই এখন মামলার তদন্তে নামবে। তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযোগের সূত্র, তুলির বক্তব্য, ভিডিও বা অনলাইন কনটেন্ট—সবকিছু যাচাই করে তারপর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। আইনজীবীরা মনে করছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আদালত মামলার ভবিষ্যৎ ধারা নির্ধারণ করবে।
পিবিআই কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, তারা অভিযোগের বিষয়বস্তুর সত্যতা এবং অভিযুক্ত বক্তব্যের প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখবেন। বিশেষত, তুলি আসলে কোন বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি কীভাবে প্রচারিত হয়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি কীভাবে প্রভাবিত হয়েছে—সবগুলো বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সানজিদা ইসলাম তুলি বা বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, তুলি নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকায় তিনি বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পরবর্তীতে জানাবেন।
মামলার পরবর্তী তারিখ আদালত নির্ধারণ করে দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আদালত অভিযোগ আমলে নেবে কি না—তা নির্ভর করবে পিবিআইয়ের অনুসন্ধানী তথ্যের ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এ মামলা তুলিকে শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিকভাবেও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন