বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (সিআরপিসি) একটি মৌলিক আইন। এই আইনের ১৫৪ ধারা ও ৫৪ ধারা নাগরিকের অধিকার, পুলিশের দায়িত্ব এবং গ্রেপ্তারের বৈধতা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে এই দুটি ধারা নিয়ে নানা ভুল ধারণা ও অপব্যবহারের অভিযোগ থাকায় বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
১৫৪ ধারা কী
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারা মূলত মামলা গ্রহণ বা এজাহার (এফআইআর) লিপিবদ্ধ করার ধারা। কোনো আমলযোগ্য (Cognizable) অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ এই ধারার আওতায় অভিযোগ গ্রহণ করে মামলা রুজু করে।
সহজভাবে বললে, ১৫৪ ধারা মানে, থানায় গিয়ে কোনো আমলযোগ্য অপরাধের লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দিলে পুলিশ তা নথিভুক্ত করতে বাধ্য।
১৫৪ ধারা কখন জারি হয়
যখন কোনো ব্যক্তি হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ, গুরুতর মারধর, অস্ত্র বা সন্ত্রাসী অপরাধের মতো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ করে।
অভিযোগ মৌখিক হলে পুলিশ লিখে পড়ে শোনাবে এবং অভিযোগকারীর স্বাক্ষর নেবে।
অভিযোগ গ্রহণের পর থানায় এজাহার নম্বরসহ মামলা রুজু করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ১৫৪ ধারা কোনো শাস্তি বা গ্রেপ্তারের ধারা নয়। এটি শুধুমাত্র মামলা শুরু করার আইনি ভিত্তি।
৫৪ ধারা কী
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা হলো পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারা। এই ধারায় পুলিশ নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
৫৪ ধারায় কখন গ্রেপ্তার করা যায়
আইন অনুযায়ী, পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারে যদি,
ব্যক্তি কোনো আমলযোগ্য অপরাধে জড়িত বলে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ থাকে।
অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা চলছে বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে।
অভিযুক্ত পলায়নের চেষ্টা করে।
পরিচয় গোপন করে বা ভুয়া পরিচয় দেয়।
আদালতের আদেশ অমান্য করে।
তবে সন্দেহের ভিত্তিতে ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার করা আইনসম্মত নয়, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত (বিশেষত ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায়) ৫৪ ধারার অপব্যবহার রোধে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন,
গ্রেপ্তারের সময় কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে তার অপরাধের কারণ জানাতে হবে।
নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে।
আইনজীবী বা স্বজনকে জানানোর সুযোগ দিতে হবে।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হলে জামিনের সুযোগ আছে কি:
সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ, জামিনের সুযোগ আছে, তবে তা অপরাধের ধরন অনুযায়ী নির্ভর করে।
জামিনের আইনি ভিত্তি
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ও ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী জামিনের বিধান রয়েছে।
১. আমলযোগ্য কিন্তু জামিনযোগ্য অপরাধ: এসব ক্ষেত্রে আসামি জামিন পাওয়ার অধিকারী। পুলিশ বা আদালত জামিন দিতে পারে।
২. অ-জামিনযোগ্য অপরাধ: এখানে জামিন আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। বিচারক অপরাধের গুরুতরতা, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও পলায়নের আশঙ্কা বিবেচনা করেন।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের বাস্তবতা:
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার মানেই জামিন অযোগ্য, এই ধারণা ভুল। অনেক ক্ষেত্রে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে বা প্রাথমিক প্রমাণ দুর্বল হলে আদালত জামিন দিয়ে থাকেন।
পুলিশ রিমান্ড ও ৫৪ ধারা:
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের পর পুলিশ যদি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চায়, তবে আদালতের অনুমতি নিতে হয় (সিআরপিসি ১৬৭ ধারা)। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করার আগে,
গ্রেপ্তারের বৈধতা
অভিযোগের ভিত্তি
নির্যাতনের আশঙ্কা
এসব বিষয় বিবেচনা করে।
নাগরিকের করণীয়
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার বা ১৫৪ ধারায় মামলা হলে নাগরিকদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় আছে,
১. আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া: গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গেই আইনগত সহায়তা নেওয়া উচিত।
২. গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাওয়া: এটি অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার।
৩. জামিনের আবেদন করা: ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই প্রাথমিকভাবে জামিন চাওয়া যায়।
৪. নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে আদালতে জানানো: আদালত প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারেন।
১৫৪ ও ৫৪ ধারা: ভুল ধারণা ও বাস্তবতা
ভুল ধারণাবাস্তবতা১৫৪ ধারা মানেই গ্রেপ্তার১৫৪ ধারা শুধু মামলা রুজুর ধারা৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার মানেই জামিন নেইঅপরাধভেদে জামিনের সুযোগ আছেপুলিশ ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার করতে পারেআদালতের নির্দেশনা মানতে বাধ্য।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন