চানখাঁরপুল গণহত্যা মামলা

ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুরসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৫ পুলিশ সদস্যের কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৬, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুরসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৫ পুলিশ সদস্যের কারাদণ্ড

জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ আজ এক জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় প্রদান করেন। রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ডিএমপির তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল তাঁর রায়ে তিনজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন। তাঁরা হলেন:

১. হাবিবুর রহমান: ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার।
২. সুদীপ কুমার চক্রবর্তী: ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার।
৩. শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলাম: রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি)।

মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত এক বিশেষ আদেশে এই তিন সাজাপ্রাপ্ত আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কোনো পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এটিই প্রথম।

শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের কমান্ডিং পজিশনে থাকা আরও পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ডসমূহ নিম্নরূপ:

মোহাম্মদ ইমরুল (সাবেক এসি, রমনা অঞ্চল): ৬ বছরের কারাদণ্ড।
মো. আরশাদ হোসেন (সাবেক পরিদর্শক, শাহবাগ থানা): ৪ বছরের কারাদণ্ড।
মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলাম (সাবেক কনস্টেবল): এই তিনজনকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না। বিশেষ করে চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশ বাহিনীর কতিপয় কর্মকর্তা যেভাবে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং নিজেরা গুলি চালিয়েছিলেন, তা মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান তাঁর অধস্তন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নির্বিচারে বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা গণহত্যার শামিল। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আদালত নিশ্চিত হয়েছে যে, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন।

আজ সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীও রায়ের সময় উপস্থিত ছিলেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার দীর্ঘ রায়টি পড়ে শোনান। রায়ের সময় ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় থাকা আসামিদের বিমর্ষ অবস্থায় দেখা যায়।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটররা এই রায়কে 'ঐতিহাসিক' বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে কেউ পার পায় না। এই সাজা ভবিষ্যতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবীরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন এবং উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে থাকা জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবার এবং ছাত্র-জনতার মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত সাজা কার্যকরের দাবি তুলেছেন। চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহতদের এক স্বজন বলেন, আমরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে চাই না, এই খুনিদের যেন দ্রুত ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

চানখাঁরপুল গণহত্যা মামলা কেবল একটি আইনি লড়াই ছিল না, এটি ছিল জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তঋণ শোধের একটি প্রক্রিয়া। ডিএমপি কমিশনারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই দণ্ড বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করল। এখন দেখার বিষয়, আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এই দণ্ড কবে কার্যকর করা হয়।

এএন