বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ভাগ্নি, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বার টিউলিপ সিদ্দিককে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। সোমবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক মোহাম্মদ রবিউল আলম এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রাজউক (RAJUK) পূর্বাচল প্রকল্পে সরকারি জমি বরাদ্দে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগে তাদের এই সাজা দেওয়া হয়।
আদালত শেখ হাসিনাকে দুটি পৃথক মামলায় ৫ বছর করে মোট ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। অন্যদিকে, তার ভাগ্নি এবং যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির আলোচিত নেতা টিউলিপ সিদ্দিককে প্রতিটি মামলায় ২ বছর করে মোট ৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক (ববি) ও আজমিনা সিদ্দিক: শেখ রেহানার দুই সন্তানকে পৃথকভাবে ৭ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক জরিমানা: দণ্ডিত প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও অতিরিক্ত কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
অন্যান্য আসামি: এই মামলায় অভিযুক্ত সাবেক রাজউক কর্মকর্তা খুরশিদ আলমসহ আরও ১৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের শাসনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার বোন শেখ রেহানার সন্তানদের নামে পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়েছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, টিউলিপ সিদ্দিক তার খালা শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করে তার ভাই ও বোনের নামে এই জমিগুলো আত্মসাৎ করতে সহায়তা করেন। যদিও টিউলিপ এই অভিযোগকে "রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" বলে অভিহিত করেছেন, তবে আদালত তার ‘বিশেষ প্রভাব’ ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন।
টিউলিপ সিদ্দিক একজন ব্রিটিশ নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার শক্তিশালী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আদালত তাকে এই সাজা প্রদান করায় আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতিপূর্বে তিনি এই মামলার কারণে তার ব্রিটিশ মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই লন্ডনের পুলিশকে টিউলিপ ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করে হস্তান্তর করার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় এই সাজা কার্যকর হওয়া নিয়ে আইনি জটিলতা রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৬৬৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে:
মানবতাবিরোধী অপরাধ: জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তাকে ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতির ধারাবাহিক সাজা: এই সর্বশেষ রায়ের আগে আরও চারটি মামলায় তাকে মোট ২৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে তার সাজার মেয়াদ এখন পাহাড়সম।
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় রাজনৈতিক ময়দান এখন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দখলে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, গত ১৫ বছর ধরে দেশে যে ‘পারিবারিক তান্ত্রিক’ শাসন চলেছিল এবং যেভাবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা সরকারি জমি আত্মীয়করণের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়েছে, এই রায় তারই উপযুক্ত জবাব। ভোটারদের দাবি, নতুন যে সরকারই আসুক না কেন, তারা যেন এই ‘Character of Corruption’ বা দুর্নীতির চরিত্র থেকে দূরে থাকে।
আমরা এমন এক স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম যেখানে আইনের শাসন থাকবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্নি হওয়ার সুবাদে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না—আজকের রায় এটাই প্রমাণ করে। — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাধারণ ভোটার।
তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলো যখন ভোটারদের মনে গণতন্ত্রের নতুন আশা জাগাচ্ছে, তখন শেখ হাসিনা পরিবারের এই সাজা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিচারের মাধ্যমে ‘পারিবারিক আত্মীয়করণ’ এবং ‘একনায়কতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা নির্মূল হওয়ার একটি পথ প্রশস্ত হলো।
বাংলাদেশের মানুষ আজ স্বপ্ন দেখছে এমন এক ভোরের, যেখানে দিনের ভোট দিনেই হবে এবং কোনো শাসক আর নিজেকে দেশের মালিক মনে করবে না। ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, এটি হবে গত দেড় দশকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যালটের মাধ্যমে দেওয়া সাধারণ মানুষের চূড়ান্ত রায়। শেখ হাসিনা ও টিউলিপ সিদ্দিকের এই সাজা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন