বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক কলঙ্কিত এবং বীভৎস অধ্যায়ের অবসান ঘটল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শেষ লগ্নে সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার পর ভ্যানে স্তূপ করে পুড়িয়ে দেওয়ার সেই পৈশাচিক ঘটনার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পুনর্গঠিত হওয়ার পর এটিই তাদের প্রথম রায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন যখন পুরো দেশ বিজয়ের আনন্দে ভাসছিল, তখন সাভারের আশুলিয়া থানা এলাকায় নেমে আসে এক নারকীয় তান্ডব। পুলিশ ও তৎকালীন শাসক দলের ক্যাডারদের গুলিতে ছয়জন নিস্পাপ তরুণ নিহত হন। কেবল হত্যা করেই ঘাতকেরা ক্ষান্ত হয়নি; তারা নিহতদের নিথর দেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
ভয়াবহ তথ্য হলো, সেই স্তূপের মধ্যে একজন গুরুতর আহত অবস্থায় জীবিত ছিলেন, তাকেও জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়। এই নৃশংসতার ভিডিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও এর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। সেদিন নিহতদের মধ্যে ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন, আস-সাবুর, তানজিল মাহমুদ, বায়েজিদ বোস্তামী ও আবুল হোসেন।
এই মামলায় মোট ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এদের মধ্যে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ আটজন পলাতক এবং বাকি আটজন বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।
দণ্ডিত ও পলাতক আসামিরা হলেন:
১. সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত)
২. ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম (পলাতক)
৩. সাবেক এসপি আসাদুজ্জামান রিপন (পলাতক)
৪. সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ (পলাতক)
৫. পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান (পলাতক)
৬. পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস (পলাতক)
৭. এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা (পলাতক)
৮. যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (পলাতক)
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন, কারাগারে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, শহিদুল ইসলাম, ডিবির পরিদর্শক আরাফাত হোসেন এবং এসআই আবদুল মালেকসহ আটজনের বিষয়েও আদালত আইনানুগ আদেশ প্রদান করেছেন।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আশুলিয়ার ঘটনাটি কেবল অপরাধ নয়, বরং এটি মানবতার ইতিহাসের এক চরম লড়াকু ও বীভৎস দৃষ্টান্ত। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম পুলিশ ও ক্যাডারদের এই নৃশংস কাজে সরাসরি প্ররোচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। লাশের স্তূপ সাজিয়ে আগুন দেওয়া সভ্য সমাজের জন্য এক বড় লজ্জা। ট্রাইব্যুনাল মনে করে, এই ধরনের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না করলে ন্যায়বিচার সুদূরপরাহত হবে।
এই রায়টি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচারের ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ দুটি মামলায় রায় দিয়েছেন:
প্রথম রায়: গত ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় রায়: গত ২৬ জানুয়ারি চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর ট্রাইব্যুনাল চত্বরে উপস্থিত নিহতদের স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহত আস-সাবুরের বাবা বলেন, আমার ছেলেকে মেরে লাশ পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। আজ বিচার পেয়েছি, তবে শান্তি তখনই পাব যখন দণ্ডিতদের ফাঁসি কার্যকর হবে।
আইনজীবীদের মতে, এই রায়ের মাধ্যমে একটি বার্তা পরিষ্কার যে—রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে লাশ পোড়ানোর মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়িয়ে দিল।
আশুলিয়ার এই মামলাটি কেবল একটি অঞ্চলের বিচার নয়, বরং এটি পুরো জাতির জন্য একটি ক্ষত। সাবেক এমপি সাইফুলের মৃত্যুদণ্ড প্রমাণ করে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। পলাতক আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন