বাংলাদেশের নারী ও কন্যাশিশুকে ঘিরে সহিংসতা ও বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
সংগঠনের মতে, সমাজের ভেতরে এমন একটি ধারা সক্রিয় হয়েছে যারা নারীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে নানা ধরনের নারীবিদ্বেষী বয়ান প্রচার করছে, যা সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করছে।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন মহিলা পরিষদের নেতারা।
সংগঠনের মতে, নারী নির্যাতন এখন কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয় এটি সামাজিক মানসিকতা, রাষ্ট্রীয় নীতি, রাজনৈতিক চর্চা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্ববোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ১০ মাসে ২,৪৬৮ নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত সংবাদ থেকেই উদ্বেগ সংগঠনের উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের ১০টি জাতীয় দৈনিকে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতনের ২ হাজার ৪৬৮টি খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এর মধ্যে ৭১৩ জন ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া যৌতুকের দাবি, পারিবারিক নির্যাতন, হত্যা, বাল্যবিবাহ, সাইবার হয়রানি, অপহরণসহ নানাধরনের সহিংসতা নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তাহীনতার চিত্র তুলে ধরেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মহিলা পরিষদের মতে, যেহেতু এগুলো কেবল প্রকাশিত ঘটনা তাই প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সমাজে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নারীবিদ্বেষী মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন প্রচারণা নারীকে সামাজিকভাবে দুর্বল করে ও নির্যাতনের পথ আরও প্রশস্ত করে।
তিনি আরও বলেন, কেবল কঠোর আইন থাকলেই চলবে না; আইন প্রয়োগে জবাবদিহি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণ জরুরি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়ার মতো বক্তব্য দিয়ে নারীর সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে। আজকের নারীরা নিজের অবস্থান নিজেরাই জানান দিচ্ছেন, এগিয়ে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে আর কেউ দমন করতে পারবে না।
মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম সাম্প্রতিক মব সহিংসতার ঘটনাগুলোকে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে বিচার ব্যবস্থা চলে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশু।
পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সহিংসতা কমার কোনো লক্ষণই নেই।
আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই হবে যখন তারা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারবেন। সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন না হলে নারী প্রতিনিধিত্ব মুখচেনা ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়।
তিনি বলেন, ‘অমুকের ভাবি’ বা ‘তমুকের স্ত্রী-বোন’ এই সংস্কৃতি নারীর রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তিনির্ভর করে ফেলে এটা পরিবর্তন করতে হবে। সহিংসতার সামগ্রিক প্রভাব শুধু নারী নয়, সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত সংগঠনের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, নারী নির্যাতন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানে।
তিনি বলেন, একজন নারী শারীরিক-মানসিক ক্ষতির শিকার হলে শুধু তার জীবনই বাধাগ্রস্ত হয় না দেশের শ্রমবাজার, শিক্ষা ক্ষেত্র এবং সামাজিক উন্নয়নও ব্যাহত হয়। নারীর সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রাষ্ট্রও পিছিয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সহিংসতা নারীর কর্মক্ষমতা কমায়, শিক্ষার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করে, পরিবারে অস্থিরতা বাড়ায়, রাজনৈতিক ও জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ কমে যায়। ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে নির্যাতনের শিকার বিবিএস জরিপ সংবাদ সম্মেলনে এবারের বিবিএস জরিপের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী তাদের নিকটজন বিশেষ করে স্বামীর হাতে শারীরিক, যৌন, মানসিক বা আর্থিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মহিলা পরিষদের মতে, এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা, যা সমাজের গভীরে থাকা নারীবিদ্বেষী মনোভাবেরই প্রতিফলন।
সাইবার সহিংসতাকেও কেন্দ্র করে এ বছর মহিলা পরিষদ ১৬ দিনের কর্মসূচি পালন করছে ‘সাইবার সহিংসতাসহ নারী ও কন্যার প্রতি সকল প্রকার নির্যাতনকে না বলুন’ স্লোগান নিয়ে। কর্মসূচিতে থাকবে—সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনি সহায়তা, সামাজিক প্রচার, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমে প্রচারণা। বহুমুখী সুপারিশ—রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে আলাদা ভূমিকা নিতে হবে সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম, রাষ্ট্র ও সরকার—সবার জন্য আলাদা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পারিবারিক পর্যায়ে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি, ছেলে সন্তানদের সমতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেখানো, গণমাধ্যমে নারী সংবেদনশীল প্রতিবেদন মানদণ্ড, আইন প্রয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, নারীর আত্মশক্তি ও নেতৃত্ব গঠনে নতুন উদ্যোগ, সমাজে সহনশীলতার সংস্কৃতি তৈরি।
মহিলা পরিষদের মতে, নারী নির্যাতন দমনে আইনই যথেষ্ট নয় সমাজের মানসিকতা, রাষ্ট্রীয় নীতি ও গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল আচরণকেও সমান্তরালভাবে সক্রিয় হতে হবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন