মতিউর রহমান

সরকার বদলালেও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভাগ্য বদলায় না

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ০২:০১ পিএম
সরকার বদলালেও স্বাধীন সাংবাদিকতার ভাগ্য বদলায় না

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গত পাঁচ দশকের অম্ল মধুর অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে আজ এক মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকরা। রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬ এ প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এক দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল, ব্যক্তিগত বা আদর্শিক ভিন্নতা যাই থাকুক না কেন, সাংবাদিকতা পেশার অস্তিত্ব রক্ষায় সংবাদকর্মীদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য এখন সময়ের দাবি।

নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ এবং সম্পাদক পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মিলনে মতিউর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, যেকোনো সংকটে বা যেকোনো সময়ে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ কেবল শত্রুপক্ষকেই শক্তিশালী করে। যা শেষ পর্যন্ত পুরো পেশার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়।

ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বড় অগ্রগতি টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল এবং সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে উপস্থিত হওয়াকে মতিউর রহমান গত ১৫ বছর কিংবা স্বাধীনতার পরবর্তী ৫৫ বছরের মধ্যে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এই সম্মিলিত অবস্থান একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা কে কোন মতের, কোন আদর্শের বা কোন ভাবনার সেটি বড় কথা নয়। সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং সংহতি প্রকাশ করা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।

সরকারের পরিবর্তনের মিথ এবং বাস্তবতা মতিউর রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে রাষ্ট্রব্যবস্থার এক রূঢ় সত্য। তিনি দেশবাসীকে এবং সহকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট সরকার বা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসলেই গণমাধ্যমের সব সংকট মিটে যাবে এমনটি ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

নিজের ৫৫ বছরের দীর্ঘ পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতেও কোনো সরকার আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়নি, আগামীতেও যে অনায়াসে দেবে, তা ভাবার সুযোগ নেই। এটি আমাদের ইতিহাসের এক তিক্ত শিক্ষা। তাঁর মতে, গণমাধ্যমের প্রতি বৈরী আচরণ সব আমলেই কম বেশি দেখা গেছে, কেবল রূপ বদলেছে মাত্র।

নিপীড়নের নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস সাংবাদিকতার ওপর রাজনৈতিক খড়্গের ইতিহাস টানতে গিয়ে মতিউর রহমান বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমানের ওপর হওয়া নির্যাতনের উদাহরণ দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭৫ সালে দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার যে স্বৈরতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম বড় আঘাত।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার পরের সেই বড় পদক্ষেপটি মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এরপর সামরিক শাসন এসেছে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসন এসেছে, কিন্তু সংবাদপত্র বা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই রকম থেকে গেছে। ছোট, বড় বা মাঝারি কোনো না কোনো মাত্রার নিপীড়ন সব সময়ই জারি ছিল।

আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের উদ্যোগ অতীতের ভুলত্রুটি এবং কাজের ধরন নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন মতিউর রহমান। তিনি স্বীকার করেন যে, গণমাধ্যমের ভেতরে যে ভুলগুলো ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক হতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে বিলম্ব হলেও এখন যে বিতর্ক ও আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তিনি আজকের এই গণমাধ্যম সম্মিলনকে একটি পরিবর্তনের লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, সাংবাদিক সমাজের ভেতর থেকে এই ধরনের সংলাপ ও উদ্যোগই আগামী দিনে স্বাধীন সাংবাদিকতার বর্ম হিসেবে কাজ করবে।

ঐক্য, সমঝোতা ও সংহতি বক্তব্যের শেষ দিকে মতিউর রহমান আগামী দিনের সাংবাদিকতার জন্য তিনটি মূল মন্ত্রের কথা বলেন যা হলো ঐক্য, সমঝোতা এবং সংহতি। তিনি মনে করেন, এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গণমাধ্যমকে টিকে থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হওয়া হামলার প্রেক্ষিতে এই সংহতি এখন কেবল নৈতিক বিষয় নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

আজকের এই সমাবেশ কেবল একটি প্রতিবাদ সভা নয়, বরং একটি নতুন ভাবনার সূচনাবিন্দু হিসেবে মতিউর রহমানের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে গণমাধ্যমের প্রান্তিক অবস্থানের একটি সঠিক ময়নাতদন্ত। যখন তিনি বলেন যে কোনো সরকারই স্বাধীন সাংবাদিকতা দেখতে চায় না, তখন তা ক্ষমতার চিরন্তন চরিত্রের দিকেই ইঙ্গিত করে। এই বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ানো। আজকের সম্মিলন সেই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের একটি শক্ত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

জেএইচআর