ঢাকায় ইরানি রাষ্ট্রদূত

স্টারলিংক ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে ইরানে সহিংসতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
স্টারলিংক ও পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে ইরানে সহিংসতা

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির ঘটনার জন্য অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ‘স্টারলিংক’ এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সরাসরি দায়ী করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি।

সোমবার সকালে ঢাকার ইরান দূতাবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে বাইরে থেকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং অপতথ্য ছড়িয়ে ইরানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।

রাষ্ট্রদূত জাহনাবাদি বলেন, বর্তমানে ইরানজুড়ে স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক হারে প্রোপাগান্ডা ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানি জনগণের একটি অংশের অসন্তোষকে ব্যবহার করে ডিজিটাল মাধ্যমে মিথ্যাচার করছে। রাষ্ট্রদূতের মতে, এই আধুনিক প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণেই বিক্ষোভকারীরা উগ্র হয়ে উঠছে এবং রাজপথে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, "ইরানজুড়ে স্টারলিংকের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। আর বিক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে পুঁজি করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে। মার্কিন সুচারু বুদ্ধিমত্তা ও পরামর্শের মাধ্যমেই এই পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।"
 
ইরানি রাষ্ট্রদূতের দাবি অনুযায়ী, চলমান এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি কেবল সাধারণ নাগরিক অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বিদ্রোহীরাই প্রথম পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করে। পরবর্তীতে এই আক্রমণগুলোকে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে জনমতকে বিভ্রান্ত করছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী প্রথম পর্যায়ে সংযম দেখালেও সশস্ত্র উসকানির মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তবে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো কেবল একপক্ষীয়ভাবে মৃত্যুর খবর প্রচার করছে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ইরানের গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বিক্ষোভকারীরা কীভাবে এত সংগঠিত হলো এবং সহিংসতা কেন ঠেকানো গেল না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে রাষ্ট্রদূত জাহনাবাদি বলেন, ইরান ইতিমধ্যে বিদেশি স্যাটেলাইট থেকে আসা প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, প্রযুক্তিগত যুদ্ধে ইরান এখন পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ইরানে চলমান এই সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো বিভিন্ন পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেও রাষ্ট্রদূত জাহনাবাদি কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, পরিস্থিতির জটিলতার কারণে নিহতের সঠিক পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়, তবে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হামলায় পুলিশ সদস্যসহ অনেক সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

জলিল রহিমি জাহনাবাদির বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, তেহরান এই বিক্ষোভকে কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখছে না; বরং একে ‘হাইব্রিড ওয়ার’ বা প্রযুক্তিগত যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করছে। তাঁর মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার জন্য এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো একনজরে:

প্রযুক্তির অপব্যবহার: স্টারলিংকের মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয়েছে।
সশস্ত্র উসকানি: বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে বাইরে থেকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
 পশ্চিমা ভূমিকা: এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে।
প্রতিরোধ: ইরান সফলভাবে বিদেশি স্যাটেলাইট প্রোপাগান্ডা রুখে দিচ্ছে।

ঢাকার ইরান দূতাবাসে রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে পশ্চিমা বিশ্ব ইরানে ইন্টারনেট স্বাধীনতার কথা বলছে, অন্যদিকে তেহরান একে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত ও অপতথ্য ছড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। ইলন মাস্কের স্টারলিংক প্রযুক্তি কীভাবে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব ফেলতে পারে, রাষ্ট্রদূত জাহনাবাদির অভিযোগ সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিল।

এএন