বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একটি পথহারা জাতির সঠিক গন্তব্যে ফেরার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। গত দেড় দশকে ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি পুরো প্রজন্ম যখন প্রথমবার ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়, তখন তাদের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ—একটি ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি আর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি হারিয়ে যাওয়া আস্থা পুনরুদ্ধার।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। বিরোধী দলের অনুপস্থিতি আর কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক কাঠামোয় যে কর্তৃত্ববাদী ধারা শক্তিশালী হয়েছিল, তাতে সাধারণ মানুষের জবাবদিহি চাওয়ার জায়গাটি নষ্ট হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এবারের নির্বাচন সেই আস্থার সংকট কাটানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ। একটি প্রজন্মের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। বরং ভোটের পর যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাদের সামনে থাকবে এক বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতা। গত ১৬ বছরের নীতিগত উদাসীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা আজ তলানিতে।
মূল্যস্ফীতির বোঝা: উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে খাদ্যে।
ব্যাংক খাতের ক্ষত: খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ ব্যাংকগুলো এখন বিনিয়োগের বদলে ঝুঁকির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগের খরা: বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়েই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার হাত দিতে হবে। এই তিনটি বিষয় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত নির্বাচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সিন্ডিকেট ও মজুতদারদের যে রাজত্ব তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে হবে।
করণীয়: বাজার তদারকি জোরদার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবহন অবকাঠামো উন্নত করা। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে এবং সরকারের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমাতে হবে।
বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে।
করণীয়: ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা (Ease of Doing Business), সরকারি সেবাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজড করা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো। ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান যাচাই করে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।
প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের বড় অংশই বেকার থাকছে। শিক্ষিত বেকারত্বের হার সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
করণীয়: শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) সহজ শর্তে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করা।
আগামী সরকার যে সিদ্ধান্তগুলো নেবে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামী দুই দশকের বাংলাদেশের ভাগ্য। গণতন্ত্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার সমন্বয় ছাড়া কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না। সুশাসন জোরদার না করলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল কে দেশ শাসন করবে তার পরীক্ষা নয়, বরং দেশ কীভাবে শাসিত হবে—সেই দর্শন নির্ধারণের লড়াই। নতুন সরকারের জন্য এটি যেমন কঠিন পথ, তেমনি একটি স্থবির রাষ্ট্রকে গতিশীল করার শ্রেষ্ঠ সুযোগ। এই সুযোগ হাতছাড়া হলে বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। সাহসের সাথে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেই কেবল সম্ভব একটি সমৃদ্ধ ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন