মেট্রোরেল

ভোরে যাত্রীশূন্য স্টেশন-রাতে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচী পুনর্বিন্যাসের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
ভোরে যাত্রীশূন্য স্টেশন-রাতে উপচে পড়া ভিড়, সময়সূচী পুনর্বিন্যাসের দাবি

ঢাকার যানজট নিরসনে আশীর্বাদ হয়ে আসা মেট্রোরেলের সময়সূচী নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে চলাচলের সময় উভয় দিকে এক ঘণ্টা বাড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। দেখা যাচ্ছে, ভোরের বর্ধিত সময়ে যাত্রী সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, অথচ রাতের শেষ ট্রেনেও তিল ধারণের জায়গা থাকছে না। এই প্রেক্ষাপটে সকালে বাড়তি সময় কমিয়ে রাতে চলাচলের সময় আরও বাড়ানোর জোরালো দাবি তুলেছেন সাধারণ যাত্রী ও কর্মজীবীরা।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) গত ১৯ অক্টোবর থেকে মেট্রোরেল চলাচলের সময়সূচীতে পরিবর্তন আনে। উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়ার সময় সকাল ৭টা ১০ মিনিটের পরিবর্তে ৬টা ৩০ মিনিট করা হয়। একইভাবে মতিঝিল থেকে শেষ ট্রেন ছাড়ার সময় রাত ৯টা ৪০ মিনিট থেকে বাড়িয়ে ১০টা ১০ মিনিট করা হয়।

কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করা। গত তিন মাসের (১৯ অক্টোবর থেকে ১৯ জানুয়ারি) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বর্ধিত এক ঘণ্টায় ৮ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এতে ডিএমটিসিএলের আয় বাড়লেও যাত্রী চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএমটিসিএলের দেওয়া ১১ জানুয়ারির পরিসংখ্যান এক বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরেছে। ঐ দিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত এই আধা ঘণ্টায় মাত্র ১৫১ জন যাত্রী পুরো মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেছেন। এই সময়ে দুটি ট্রেন চলাচল করলেও অনেক স্টেশনে যাত্রী ছিল হাতেগোনা।

সকালে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় ভোরের এই বর্ধিত সময়টি মেট্রোরেলের পরিচালনার ব্যয়ের তুলনায় কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ভোরের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় রাতে। ১১ জানুয়ারি রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আধা ঘণ্টায় যাত্রী যাতায়াত করেছেন ৩ হাজার ৭৪৯ জন। অর্থাৎ ভোরের তুলনায় রাতের শেষ ভাগে যাত্রীর চাপ প্রায় ২৫ গুণ বেশি।

যাত্রীদের অভিযোগ, ১০টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে ছেড়ে আসা শেষ ট্রেনটিতেও প্রচণ্ড ভিড় থাকে। অনেক সময় ভিড়ের কারণে স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা ট্রেনে উঠতে পারেন না। নিরুপায় হয়ে তাদের পুনরায় সেই চিরচেনা যানজটের বাসে বা বিকল্প পথে গন্তব্যে ফিরতে হয়। বিশেষ করে দোকানকর্মী, সংবাদকর্মী এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য বর্তমান সময়সীমাও অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য

পল্লবীর বাসিন্দা এবং শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের দোকানকর্মী মো. শাহজালাল জানান তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, "রাত ১০টা ২০ মিনিটের মধ্যে শাহবাগ স্টেশনে পৌঁছাতে না পারলে শেষ ট্রেনটি মিস হয়ে যায়। তখন বাসে করে পল্লবী ফিরতে রাত সাড়ে ১১টা পার হয়ে যায়। অথচ মেট্রো পেলে ১১টার আগেই বাসায় পৌঁছানো সম্ভব। রাতের সময়টা অন্তত আরও আধা ঘণ্টা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

যাত্রীদের এই দাবির বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ। তিনি জানান, বর্তমানে শীতকালীন ছুটি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সামগ্রিকভাবে যাত্রী সংখ্যা কিছুটা কম। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতেন, বর্তমানে তা ৪ লাখে নেমেছে।

ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা আগামী মাসে বর্ধিত সময়ের যাত্রী চলাচলের ডেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করব। যদি দেখা যায় সকালে যাত্রী চাহিদার তুলনায় খরচ বেশি হচ্ছে এবং রাতে চাহিদা অনেক বেশি, তবে আমরা সময়সূচী পুনর্বিন্যাস করব। প্রয়োজনে রাতে সময় আরও বাড়ানো হবে।

বর্তমানে মেট্রোরেল উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নিয়মিত বিরতিতে চলাচল করছে। তবে প্রকল্পের কাজ এখানেই শেষ নয়। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ডিএমটিসিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকেই এই অংশে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে যখন এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। পরবর্তীকালে রুট সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন আধুনিকায়নের ফলে বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ১৯ হাজার৭১৮ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দিচ্ছে।

যাত্রীদের যাতায়াত আরও নির্বিঘ্ন করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ। গত ১২ জানুয়ারি থেকে মেট্রোরেলের কার্ড রিচার্জের জন্য মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যার ফলে স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রিচার্জ করার ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছেন যাত্রীরা।

ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেল এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে যাত্রী চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়সূচী নির্ধারণ করা জরুরি। সকালের গুরুত্বহীন আধা ঘণ্টা সময় যদি রাতের ব্যস্ত সময়ে যুক্ত করা হয়, তবে তা হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

এএন