রাজধানী ঢাকার আবাসন খাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা ও ভাড়াটিয়াদের ভোগান্তি নিরসনে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। যুগান্তকারী এক নির্দেশিকা প্রণয়নের মাধ্যমে ডিএনসিসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে দুই বছরের আগে কোনো বাড়ির ভাড়া বাড়ানো যাবে না এবং এই ভাড়ার পরিমাণ কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই ‘বাড়িভাড়া নির্দেশিকা’ প্রকাশ করেন সংস্থাটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ।
নির্দেশিকাটি প্রকাশের আগে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ঢাকার বর্তমান আবাসন পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঢাকা মহানগরে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস হলেও উত্তর ও দক্ষিণ সিটি মিলিয়ে বাড়ি আছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ লাখ। ফলে শহরের সিংহভাগ মানুষই ভাড়াটিয়া।
তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আবাসনে ব্যয় হওয়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষকে তার আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত কেবল বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে। ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে অস্পষ্টতা ও ধীরগতির সুযোগে বাড়ির মালিকরা বারবার অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়িয়ে আসছিলেন। আজকের এই নির্দেশিকা সেই অনিয়ম বন্ধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ এর আলোকে প্রণীত এই নির্দেশিকায় ভাড়াটিয়া ও মালিক, উভয় পক্ষের অধিকার রক্ষায় ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ শর্তারোপ করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, একবার ভাড়া নির্ধারিত হওয়ার পর পরবর্তী দুই বছরের আগে তা বাড়ানো যাবে না। ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে জুন-জুলাই মাসকে নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই বছর পর ভাড়া পরিবর্তন করতে হলে তা অবশ্যই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে হতে হবে।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বার্ষিক মোট ভাড়ার পরিমাণ কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট বাড়ির বর্তমান বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। একে ‘মানসম্মত ভাড়া’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
বাড়ির মালিককে অবশ্যই বাড়িটি বসবাসের উপযোগী করে রাখতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও বর্জ্য অপসারণের নিরবচ্ছিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালিকের। বাড়ির ছাদে বাগান করার ক্ষেত্রেও মালিক ও ভাড়াটিয়া আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন।
অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ভাড়াটিয়াকে শর্তসাপেক্ষে ছাদ ও মূল ফটকের চাবি দিতে হবে। পাশাপাশি বাড়িতে ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে।
মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে এবং মালিককে অবশ্যই স্বাক্ষরিত লিখিত রসিদ প্রদান করতে হবে। ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না এবং চুক্তিপত্রে অগ্রিম জমা ও শর্তাবলি স্পষ্ট করে লিখতে হবে।
যদি কোনো ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া দিতে ব্যর্থ হন, তবে মালিক প্রথমে মৌখিক ও পরে লিখিত সতর্কবার্তা দেবেন। সব বকেয়া পরিশোধ সাপেক্ষে দুই মাসের নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করা যাবে। একইভাবে আবাসিক ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে হলেও উভয় পক্ষকে দুই মাসের সময় দিতে হবে।
নির্দেশিকাটি কেবল কাগজের কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে একটি ত্রি-স্তরীয় কাঠামো প্রস্তাব করেছে ডিএনসিসি:
ওয়ার্ড পর্যায়: সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে 'বাড়িওয়ালা সমিতি' এবং 'ভাড়াটিয়া সমিতি' গঠন করা হবে। কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে এই দুই সমিতির প্রতিনিধিরা সালিসের মাধ্যমে সমাধান করবেন।
আঞ্চলিক পর্যায়: ওয়ার্ড পর্যায়ে সমাধান না হলে অভিযোগটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার (ZEO) কাছে পাঠাতে হবে।
সচেতনতা বৃদ্ধি: সিটি করপোরেশন জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভার মাধ্যমে মালিক ও ভাড়াটিয়াদের আইন সম্পর্কে সচেতন করবে।
মোহাম্মদ এজাজ স্পষ্ট করেন যে, এই নির্দেশিকাটি কেবল ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা দেবে তা নয়, বরং যাঁরা বাড়ি ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের অধিকারও রক্ষা করবে। কোনো ভাড়াটিয়া বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে বা নিয়ম ভঙ্গ করলে মালিক যাতে আইনি সুরক্ষা পান, নির্দেশিকায় সেদিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকার মতো মেগাসিটিতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা ছিল সময়ের দাবি। আয়ের সিংহভাগ বাড়িভাড়ায় চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হচ্ছে। ডিএনসিসির এই সাহসী উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরণের স্বস্তি ফিরে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, আজ থেকেই এই নির্দেশিকা কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব বাড়ির মালিককে এই নিয়মের আওতায় আনা হবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন