ঢাকার অসহনীয় যানজট থেকে মুক্তি পেতে গত কয়েক বছরে আমরা মেট্রোরেলের (MRT) সুফল ভোগ করতে শুরু করেছি। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত এই আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা নগরবাসীর যাতায়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে সমসাময়িক রাজনৈতিক আলোচনা এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং অপরিকল্পিত শহরে মেট্রোরেলের পাশাপাশি 'মনোরেল' কি আরও বেশি কার্যকর হতে পারে? ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ঢাকার গণপরিবহন খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সাধারণ মানুষের কাছে দুটিই উড়ালপথে চলা ট্রেন মনে হলেও, এদের মধ্যে কাঠামোগত ও সক্ষমতার বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
মেট্রোরেল: এটি মূলত 'ডুয়াল ট্র্যাক' বা দুটি লাইনের ওপর চলে। এর বগি সংখ্যা বেশি থাকে এবং যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা অনেক উচ্চ। তবে এর অবকাঠামো অত্যন্ত ভারী এবং নির্মাণের জন্য চওড়া রাস্তা ও বড় জায়গার প্রয়োজন হয়।
মনোরেল: এটি একটি মাত্র 'গাইডওয়ে' বা বিমের ওপর ভর করে চলে। এর অবকাঠামো অনেক হালকা এবং চিকন খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মনোরেল খুব সরু রাস্তা দিয়ে এবং অত্যন্ত বাঁকা পথেও অনায়াসে চলাচল করতে পারে।
ঢাকার সব এলাকা মতিঝিল বা উত্তরার মতো প্রশস্ত নয়। পুরোনো ঢাকা, খিলগাঁও, বাসাবো বা মোহাম্মদপুরের ভেতরের রাস্তাগুলো এতটাই সরু যে সেখানে মেট্রোরেলের বিশাল পিলার বসানো অসম্ভব। এই বাস্তবতায় মনোরেল হতে পারে এক আদর্শ সমাধান।
ঢাকার অনেক এলাকা এখন পর্যন্ত আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার বাইরে। মেট্রোরেল করতে গেলে অনেক ভবন ভাঙার প্রয়োজন পড়ে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সামাজিক ও আইনি জটিলতা তৈরি করে। কিন্তু মনোরেল যেহেতু খুব কম জায়গায় নির্মাণ করা সম্ভব, তাই খিলগাঁও বা গোড়ানের মতো ঘিঞ্জি এলাকাকেও মূল শহরের সাথে যুক্ত করা সহজ হবে।
ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। পাতাল রেলের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ৩,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিপরীতে, ভারতের মুম্বাইয়ের উদাহরণ টানলে দেখা যায়, সেখানে মনোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে মাত্র ১৬৪ কোটি টাকা। নির্মাণ ব্যয় কম হলে স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীদের জন্য ভাড়ার হারও সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব।
মেট্রোরেল সাধারণত সোজা পথে চলতে পছন্দ করে। বড় মোড় বা বাঁক নিতে গেলে এর গতি কমিয়ে দিতে হয় এবং কারিগরি জটিলতা বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিজয় সরণি থেকে খামারবাড়ি যাওয়ার পথে মেট্রোরেল যে বিশাল বাঁক নিয়েছে, সেখানে মনোরেল থাকলে রাস্তার ওপর দিয়েই সহজে মোড় নেওয়া যেত। এতে সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর এলাকার ভেতরে প্রবেশ করার প্রয়োজন হতো না।
বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে মেট্রোরেল এবং মনোরেল একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। জাপান, চীন, মালয়েশিয়া এবং ভারতে এই দুই ব্যবস্থার সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
মুম্বাই মডেল: মুম্বাইয়ে মেট্রোরেলের পাশাপাশি ২০ কিলোমিটার মনোরেল চালু রয়েছে। এটি দৈনিক প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করে।
মিশর ও চীন: মিশরের কায়রোতে ৯৬ কিলোমিটারের বিশাল মনোরেল প্রকল্পের কাজ চলছে, যেখানে খরচ হচ্ছে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনৈতিক মহলেও মনোরেল নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও বনানীর মতো এলাকাগুলোকে মেট্রোরেলের সাথে যুক্ত করতে মনোরেল চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের যানজট নিরসনেও ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি মনোরেল রুটের পরিকল্পনা নিয়ে ওরাসকম ও আরব কন্ট্রাক্টরসের সাথে সমঝোতা স্মারক সই করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক মনে করেন, শুধুমাত্র মেট্রোরেল দিয়ে ঢাকার পুরো ট্রাফিক চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। তার মতে, মেট্রোরেলের পাতালপথ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে যে হারে খরচ বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমাদের বিকল্প হিসেবে মনোরেল নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বড় রাস্তা নেই, সেখানে মনোরেলই সবচেয়ে উপযোগী সমাধান।
মনোরেলের বড় একটি সীমাবদ্ধতা হলো এর যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা। মেট্রোরেল যেখানে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ হাজার যাত্রী টানতে পারে, মনোরেল সেখানে ১০ থেকে ৩০ হাজারের বেশি নিতে পারে না। ঢাকার মতো বিশাল জনসংখ্যার শহরে শুধুমাত্র মনোরেল দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। জাকার্তার মতো শহরে যাত্রী চাপের কারণে মনোরেল প্রকল্প সফল হয়নি।
তবে সমাধান লুকিয়ে আছে 'সমন্বিত ব্যবস্থায়'। মেট্রোরেল হবে মূল 'ব্যাকবোন' বা মেরুদণ্ড, যা বড় বড় স্টেশনে যাত্রী পৌঁছে দেবে। আর মনোরেল কাজ করবে 'ফিডার সার্ভিস' হিসেবে যা পাড়া-মহল্লা থেকে যাত্রীদের প্রধান মেট্রোরেল স্টেশনে নিয়ে আসবে।
বাংলাদেশে যেকোনো বড় প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হওয়া নিয়ে নিয়মিত বিতর্ক হয়। মুম্বাইয়ে যা ১৬৪ কোটিতে হয়, বাংলাদেশে তা কেন ১৫০০ কোটি ছাড়ায় এই প্রশ্নটি সাধারণ জনগণের মনেও রয়েছে। মনোরেল চালু করতে গেলে স্বচ্ছতা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে আনা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকার মতো মেগাসিটিতে মেট্রোরেল এবং মনোরেল একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং বন্ধু হতে পারে। মেট্রোরেল আমাদের দ্রুতগতিতে দূরপাল্লার পথ পার করে দেবে, আর মনোরেল আমাদের গন্তব্যের একদম কাছাকাছি নিয়ে যাবে।
আগামী কয়েক বছরে ঢাকা কি কেবল ব্যয়বহুল পাতাল রেলের ওপর নির্ভর করবে, নাকি মনোরেলের মতো সাশ্রয়ী ও কার্যকর প্রযুক্তি গ্রহণ করে পুরো শহরকে নেটওয়ার্কের আওতায় আনবে তা নির্ভর করবে নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে মনোরেল হতে পারে যানজটমুক্ত ঢাকার এক নতুন অধ্যায়।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন