আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটারদের মনে আস্থা ফেরাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনা সদর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে আইন অনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন, সেনাবাহিনী তার সবকিছুই করবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ‘বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা’ বা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
তিনি সাফ জানিয়ে দেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করবে এবং যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা প্রতিরোধে তারা বদ্ধপরিকর।
নির্বাচনী পরিবেশকে নিচ্ছিদ্র করতে গত কয়েক সপ্তাহে সেনাবাহিনী তাদের সদস্য সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১০ জানুয়ারি মাঠপর্যায়ে সেনা সদস্যের সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয়েছিল এবং ২০ জানুয়ারি থেকে তা আরও বাড়িয়ে ১ লাখ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোায়েত রয়েছেন। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টিতেই সেনাবাহিনী অবস্থান নিয়েছে এবং ৪১১টি উপজেলা ও মহানগর এলাকাগুলোতে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
বিগত কয়েক দিনের অভিযানে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, ২০ জানুয়ারি থেকে গত ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক আধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিহ্নিত ২২ হাজার ২৮২ জন সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়ায় একটি বড় অভিযানে ৪টি বিদেশি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেডসদৃশ হাতবোমা উদ্ধার করা হয়, যা বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনার অংশ হতে পারত।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ইতোমধ্যে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেনাপ্রধানের নির্দেশনার দুটি প্রধান দিক রয়েছে, অসামরিক প্রশাসনকে আশ্বস্ত করা যে, প্রয়োজনে সেনাবাহিনী তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সহায়তা করবে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করা যে, তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন এবং তাদের ভোটের পবিত্রতা রক্ষা করা হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুর্গম ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও কর্মকর্তাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে সেনাবাহিনী। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দিতে বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এবারের নির্বাচনের জন্য ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে ভোটারদের নিরুৎসাহিত করা বা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার রোধে তিনি গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও সহযোগিতা কামনা করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির অংশ। যতক্ষণ জানমালের ক্ষতি না হয়, ততক্ষণ এটি প্রশাসনিক বিষয়। তবে অসামরিক প্রশাসন সহায়তা চাইলে সেনাবাহিনী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে।
ভোটের দিন কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেনাবাহিনী কী করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, আইন অনুযায়ী যা যা করণীয়, তা করতে সেনাবাহিনী সর্বদা প্রস্তুত। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সেনাবাহিনীর এই সজাগ উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি দিচ্ছে এবং দুষ্কৃতকারীদের জন্য এটি একটি কড়া হুঁশিয়ারি।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন