দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর এক অভূতপূর্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সাক্ষী হচ্ছে বাংলাদেশ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক গণভোট। মাঘের শীত উপেক্ষা করে ভোর থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি নজর কেড়েছে। তবে উৎসবের আমেজের সমান্তরালে দেশের কিছু স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, কারচুপি আর এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বত্রই এখন একটিই দৃশ্য, তা হলো ভোটের উৎসব। তবে এবারের ভোট কেবল প্রার্থী নির্বাচনের নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশের সংবিধান নির্ধারণেরও। সকাল থেকেই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর গুলশান মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি। ভোট প্রদান শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, আজকে নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন। আমরা দুঃস্বপ্নময় অতীত বর্জন করলাম এবং প্রতিটি পদে নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টির সুযোগ পেলাম। তিনি গণভোটকে দেশের জন্য 'মহা মুক্তির দিন' হিসেবে অভিহিত করেন।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী তারেক রহমান একই কেন্দ্রে ভোট দেন। তিনি বলেন, জনগণ যদি ভোট দিতে পারেন, তবে যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব। তবে তিনি গত রাতে দেশের কিছু স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিত খবরের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মিরপুর মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়ে তিনি বলেন, "তিনটি ভোট হারানোর পর আজ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলাম। এই ভোটের মাধ্যমে ১৮ কোটি মানুষের সরকার গঠিত হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই প্রার্থী নিজ জেলায় ভোট দিয়ে বলেন, "জনগণ একটি সুস্থ নির্বাচনের অপেক্ষায় ছিল।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেলা ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে ৩২ হাজার ৭৮৯টি কেন্দ্রে গড় ভোট পড়ার হার ৩২.৮৮ শতাংশ। প্রথম চার ঘণ্টায় সিলেটে প্রায় ২০ শতাংশ ভোট পড়েছে।
রাজধানীর আসনগুলোতে উপস্থিতি সকালের দিকে ৬-১৩ শতাংশ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি ভোটার সম্বলিত গাজীপুর-২ আসনে ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

ঢাকা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ভোট দিয়ে বেরিয়ে বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো ফলাফল মেনে নেওয়া হবে না। আমি এখনো কারচুপির আশঙ্কা করছি।

ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অভিযোগ করেন, বানোয়াট নিয়ম দেখিয়ে তাঁর পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে।
সদর উপজেলার একটি কেন্দ্রে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় দুই আনসার সদস্যসহ তিনজন আহত হয়েছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেছেন, তাঁর তিন কর্মীকে বিনা দোষে আটক করা হয়েছে।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আজ সকালে সশরীরে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং ভোটারদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, সম্মানিত ভোটারদের অনুরোধ করব, আপনারা নির্ভয়ে বাসা থেকে বের হয়ে ভোট দিন। আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে। সারা দেশে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছেন। অনেক কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা এবং বডি-ওন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। ধানমন্ডি ও মিরপুরের কেন্দ্রগুলোতে তরুণ ভোটাররা জানান, তারা জীবনের প্রথম ভোট দিতে পেরে রোমাঞ্চ অনুভব করছেন। তবে গণভোট নিয়ে কিছু ভোটারের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তিও লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের নিয়ম বুঝে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামে ভোট দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মো. মনু মিয়া (৫৭) নামে এক ভোটারের মৃত্যু হয়েছে। এটি ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় কোনো শোকের সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলগুলো সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন। তারা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। সামগ্রিকভাবে বিদেশের নজর এখন বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে।
বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ। যদিও শীতের সকালে উপস্থিতি কিছুটা ধীর ছিল, তবে দুপুরের পর কেন্দ্রগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। সাধারণ মানুষের চোখেমুখে একটাই প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ ফলাফল এবং নতুন বাংলাদেশের যাত্রা।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন