ইতিহাসে প্রথম

নতুন এমপিদের শপথ পড়াতে পারেন প্রধান বিচারপতি

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
নতুন এমপিদের শপথ পড়াতে পারেন প্রধান বিচারপতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এখন সবার দৃষ্টি নতুন সরকার গঠন এবং নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের দিকে। রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে এক অনন্য প্রক্রিয়ায় আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশ। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাতে পারেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। সাধারণত জাতীয় সংসদের স্পিকার নতুন সদস্যদের শপথ পড়িয়ে থাকেন। তবে ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এই আইনি বিকল্প বেছে নেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, শপথ অনুষ্ঠানের প্রাথমিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে প্রধান বিচারপতি এই গুরুদায়িত্ব পালন করবেন বলে জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ নিয়ে যে আইনি ও রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার সমাধানে সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইনের আশ্রয় নিচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এই প্রক্রিয়ার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধানত তিনটি ধাপ বা বিকল্প থাকে। প্রথমত স্পিকারের মাধ্যমে, যদি পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার সপদে বহাল থাকেন। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির মাধ্যমে, স্পিকার না থাকলে বা অপারগ হলে রাষ্ট্রপতি যাকে মনোনীত করবেন তিনি শপথ পড়াবেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।

তৃতীয় বিকল্প হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার, যদি তিন দিনের মধ্যে শপথ আয়োজন সম্ভব না হয় তবে তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যেহেতু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতিকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং আইনি অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তাই সরকার তাঁকে দিয়েই নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।

সংসদ সচিবালয়ের সূত্রমতে, ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে জাতীয় সংসদের শপথ কক্ষে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হতে পারে। কয়েকটি ধাপে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো হবে। প্রথম ধাপে প্রধান বিচারপতি নিজে শপথ গ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত হয়ে প্রক্রিয়া শুরু করবেন। দ্বিতীয় ধাপে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপির ২০৯ জন সদস্য এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শপথ পড়ানো হবে।

তৃতীয় ধাপে শপথ গ্রহণ শেষে সদস্যরা সংসদীয় দলিলে স্বাক্ষর করবেন এবং তাঁদের সদস্যপদ গেজেট আকারে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এর আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রের কোনো কাজই আইনি শূন্যতার কারণে আটকে থাকবে না। তিনি বলেন, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী স্পিকার না থাকলে রাষ্ট্রপতি যাকে উপযুক্ত মনে করবেন তাকেই এই দায়িত্ব দেবেন। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় এটি একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে শপথ পড়ানো হলে নবগঠিত সংসদের ওপর জনগণের আস্থা ও এর নৈতিক ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে। এটি বিশেষ করে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গুরুত্বের একটি প্রতীকী প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হলে পরবর্তী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

যেহেতু বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তাই তাদের সংসদীয় দলের নেতা তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি বরাবর সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেবেন। ধারণা করা হচ্ছে, ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রতীক্ষা এবং একটি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পর গঠিত এই সংসদ নানা কারণেই ঐতিহাসিক। প্রধান বিচারপতির হাত ধরে নতুন যাত্রার শুরু হওয়াটা কেবল একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী সম্পর্কের সূচনা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

জেএইচআর