দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের অপেক্ষা। দীর্ঘ রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই এবং একটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে আবারও ফিরছে নির্বাচিত সরকার। ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এই অনুষ্ঠানটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে এই অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক জল্পনা।
বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৭ ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি 'ঐতিহাসিক দিন' হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। দিনের শুরুতেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকেলের দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাকে বর্ণিল সাজে সাজানো হচ্ছে। বিএনপির একজন মুখপাত্র এনডিটিভি-কে জানিয়েছেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি ক্ষমতার হস্তান্তর নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার এবং দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল। এই দিনটি থেকে বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে।'
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য বিশ্বের ১৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই আমন্ত্রিত তালিকায় ভারতের পাশাপাশি রয়েছে চীন, সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আমন্ত্রিত দেশগুলোর বৈচিত্র্য বলে দিচ্ছে যে, নতুন সরকার তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে এক কাতারে আনা হয়েছে।
এই শপথ অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পাঠানো আমন্ত্রণপত্র। ঢাকা ও নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ভারতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি অত্যন্ত গভীর বার্তা বহন করে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, সেদিন মুম্বাইয়ে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কারণে তাঁর সশরীরে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক রয়েছে। সূত্র বলছে, ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর অথবা উপ-রাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণন ঢাকায় আসতে পারেন।
অতীতের বিএনপি শাসনামলগুলোতে নয়াদিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কের কিছু জটিলতা থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমান ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা ভারতের সাথে ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিএনপি নেতারা বারবার বলছেন যে, তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি (যোগাযোগ), বাণিজ্য এবং স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। ভারতও প্রতিবেশী দেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতের যেকোনো পর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতি প্রমাণ করবে যে, নয়াদিল্লি নতুন সরকারের সাথে কাজ করতে ইতিবাচক।
তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকলেও নির্বাচনে বিজয়ের পর তাঁর দেশে ফেরা এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ বিএনপি কর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। সম্প্রতি এক প্রশ্নের জবাবে তিনি 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' বা 'আগে বাংলাদেশ' নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জাতীয় স্বার্থ অটুট রেখেই দুই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
১৭ ফেব্রুয়ারির এই অনুষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হতে যাচ্ছে। চীন এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিলে সেটি ভারতের জন্য একটি কৌশলগত ভাবনার বিষয় হতে পারে। তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ড. ইউনূসের আমন্ত্রণপত্র এবং বিএনপির বর্তমান নমনীয় অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে আটকা না থেকে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে কেবল একটি দলের ক্ষমতা গ্রহণ নয়, বরং একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার প্রত্যাশা করছে সাধারণ মানুষ। দিল্লির 'ফ্রন্ট রো' বা সামনের সারিতে বসা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে বেইজিং কিংবা রিয়াদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বলে দেবে, আগামী দিনগুলোতে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে।
এখন সবার চোখ ঢাকার সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়, যেখানে কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংঘাত আর অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এক নতুন প্রশাসনিক যাত্রার সূচনা হতে যাচ্ছে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন