মন্ত্রিপরিষদের সচিব আবদুর রশিদের পদত্যাগের কারণ জানাল সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
মন্ত্রিপরিষদের সচিব আবদুর রশিদের পদত্যাগের কারণ জানাল সরকার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশিদের পদত্যাগ ও তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন মহলে চলমান জল্পনা ও অপপ্রচারের অবসান ঘটিয়ে আজ রোববার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের শীর্ষ পদ নিয়ে শুরু হয়েছিল নানা গুঞ্জন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশিদের আকস্মিক বিদায় এবং তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে নানা ধরনের ‘অনুমাননির্ভর’ খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে আজ রোববার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে নয়, বরং ড. রশিদের ব্যক্তিগত ইচ্ছাতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বার্তায় জানানো হয়েছে, ড. শেখ আবদুর রশিদ ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন এবং তা নির্বাচনের বেশ কিছু দিন আগেই। 

বিবৃতিতে বলা হয়, 'আসলে ব‍্যক্তিগত কারণেই ড. শেখ আবদুর রশিদ নির্বাচনের কিছুদিন আগেই প্রধান উপদেষ্টার নিকট দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তবে সেই সময়ে জাতীয় নির্বাচন সন্নিকটে থাকায় মাঠ প্রশাসনের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি ছিল। তাই প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ অনুরোধে তিনি নির্বাচনকালীন সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে সম্মত হয়েছিলেন।'

অর্থাৎ, নির্বাচনের সুষ্ঠু আয়োজন এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই তাঁর পদত্যাগপত্রটি এতদিন গ্রহণ করা হয়নি। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরপরই তাঁর সেই পূর্বতন আবেদন অনুযায়ী চুক্তি বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
নতুন দায়িত্বে এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া

শনিবার ড. রশিদের চুক্তি বাতিলের পর জনপ্রশাসনে বড় রদবদল আসে। প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। নবনির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে তিনি এই দ্বৈত দায়িত্ব পালন করবেন।

নিজের পদত্যাগ নিয়ে ড. রশিদ গত শনিবার সংবাদমাধ্যম কে জানিয়েছিলেন, তাঁর চলে যাওয়াটা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি বলেন, 'আমি আগেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের বিশেষ পরিস্থিতির কারণে সেটি তখন গৃহীত হয়নি। এখন সরকার আদেশ জারি করেছে।' এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রশাসনিক প্রোটোকল মেনেই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

ড. শেখ আবদুর রশিদ জনপ্রশাসনের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যাওয়ার পর দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুনরায় কর্মজীবনে ফিরে আসেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে প্রথমে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে ১৪ অক্টোবর ২০২৪-এ তাঁকে দুই বছরের মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিলেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর এখন দেশজুড়ে সাজ সাজ রব। আগামী মঙ্গলবার নতুন নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ক্রান্তিকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মতো স্পর্শকাতর পদের পরিবর্তন নিয়ে যাতে কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি না হয়, সেজন্যই সরকার এই দ্রুত ব্যাখ্যা প্রদান করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সাধারণত মেগা নির্বাচনের আগে বা পরে আমলাতন্ত্রে বড় ধরনের রদবদলকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। তবে ড. রশিদের ক্ষেত্রে সরকারের এই আগাম ব্যাখ্যা প্রমাণ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। প্রধান উপদেষ্টার অনুরোধে নির্বাচন পর্যন্ত তাঁর থেকে যাওয়া মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা ছিল, যা ভোটের দিনগুলোতে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হয়েছে।

এখন নতুন সরকারের অধীনে জনপ্রশাসন কীভাবে সাজানো হবে এবং এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া কতদিন এই অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকবেন, সেটিই দেখার বিষয়।

এএন