বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বোচ্চ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনিকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
সোমবার দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। নবনির্বাচিত সরকারের যাত্রালগ্নে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভিষেককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মামুন শিবলী স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে ড. নাসিমুল গনিকে চুক্তিভিত্তিক মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হলো এবং এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ড. নাসিমুল গনি বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের একজন দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর কর্মজীবন মসৃণ ছিল না। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন তাঁকে প্রশাসনিক মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছিল। ২০০৯ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করা হয়। টানা চার বছর ওএসডি থাকার পর ২০১৩ সালে তাঁকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে যে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাতে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ড. গনিকে পুনরায় প্রশাসনে ফিরিয়ে আনা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাঁকে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জন বিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিল। সেখান থেকেই এবার তিনি প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন হলেন।
নির্বাচন পরবর্তী এই সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নাসিমুল গনির অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে সম্প্রতি তিনি যেভাবে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সমন্বয় সামলেছেন, তা সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দীর্ঘদিন পদবঞ্চিত থাকার পর একজন কর্মকর্তার দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আরোহণকে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এর মাধ্যমে পেশাদারিত্ব এবং জ্যেষ্ঠতার মূল্যায়ন নিশ্চিত হলো।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তাঁর এই নিয়োগ চুক্তিভিত্তিক। সাধারণত মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে সরকার এমন কাউকে বেছে নেয় যার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা যায় এবং যিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে পারদর্শী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. নাসিমুল গনি সেই মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়েছেন। নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তাঁর সামনে প্রধান কয়েকটি চ্যালেঞ্জ হলো নবনির্বাচিত মন্ত্রীদের কাজের গতি তদারকি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন। পাশাপাশি বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে মাঠ প্রশাসনকে গতিশীল করা তাঁর অন্যতম লক্ষ্য হবে।
ড. নাসিমুল গনির এই নিয়োগ কেবল একটি পদোন্নতি নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বঞ্চনার অবসানের একটি প্রতীক। নতুন সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে, তখন একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ দলনেতা হিসেবে তিনি সচিবালয়কে কোন দিকে নিয়ে যান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন