দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, গুম, বিদেশে আইনি লড়াই এবং দলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব সব মিলিয়ে বহুল আলোচিত এক অধ্যায় পেরিয়ে এবার দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসীন হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর নতুন সরকার গঠন করে বিএনপি, আর সেই মন্ত্রিসভায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরটি তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের পর গত মঙ্গলবার বিএনপি সরকার গঠন করে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ গ্রহণ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। সেই তালিকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান সালাহউদ্দিন আহমদ—যা দেশের আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ প্রশাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয় তদারকির প্রধান দপ্তর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে গুমের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা—এই দুই বিবেচনায় তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রতীকী ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
৬৩ বছর বয়সী সালাহউদ্দিন আহমদ এবার কক্সবাজার–১ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদে যান। একই বছরের জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে আবারও নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেননি। সেবার কক্সবাজার–১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদে যান তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ। দলীয় সূত্র বলছে, সেই সময় তিনি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে সরাসরি অংশ নেননি।
সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে। সে সময় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি কার্যত দলের দাপ্তরিক দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। ওই রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তাঁকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করে বিএনপি। দলটির দাবি ছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে নিয়ে যায়।
ঘটনার প্রায় দুই মাস পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে তাঁকে পাওয়া যায়। মেঘালয় পুলিশের বক্তব্য ছিল, তিনি সেখানে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ঘোরাঘুরি করছিলেন এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আটক হন। এরপর বৈধ ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৮ সালে নিম্ন আদালত তাঁকে খালাস দেন। ভারত সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতও তাঁকে খালাস দেন। আইনি জটিলতা কাটিয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন।
দেশে ফিরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে গুমের অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংস্কারসংক্রান্ত আলোচনায় নেতৃত্ব দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন কাঠামো, সংবিধান সংশোধন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার পুনর্গঠন বিষয়ে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ কারণে দলের ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরও দৃঢ় হয়।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের পেকুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বাবা সাঈদুল হক এবং মা আয়েশা হক। ১৯৭৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষে ১৯৮৮ সালে প্রশাসন ক্যাডারে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি তাঁর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সড়ক ও পরিবহন খাতে নীতি নির্ধারণে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বলে দলীয় সূত্র উল্লেখ করে।
এবারের নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, সালাহউদ্দিন আহমদের পেশা আইনজীবী ও ব্যবসায়ী। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ রয়েছে চাকরি, শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র এবং স্থাবর সম্পত্তি থেকে ভাড়া।
এ ছাড়া তিনি উল্লেখ করেছেন, অতীতে ৩৮টি মামলায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা বিচারাধীন। তবে মামলাগুলোর চূড়ান্ত অবস্থা বা অব্যাহতির বিস্তারিত বিবরণ হলফনামায় নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা, গুম-খুনের অভিযোগ তদন্ত, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার এসব ইস্যুতে তাঁর অবস্থান ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে থাকবে দেশ-বিদেশের নজর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যিনি নিজে গুমের অভিযোগের শিকার হয়েছেন, তাঁর হাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যাওয়ায় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে গুম ও নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হবে কি না।
বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সালাহউদ্দিন আহমদের মন্ত্রিত্ব কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। তাঁরা মনে করছেন, অতীতের দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক ও মানবিক করার উদ্যোগ নেবেন।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিষয়েও স্বচ্ছতা জরুরি। ক্ষমতায় থেকে তিনি কীভাবে নিজেকে নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমার ভেতরে রাখবেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে গুম থেকে ফিরে আসা এক নেতার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি কতটা কার্যকরভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে পারেন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন