কাগজে মশক নিধন, বাস্তবে ভোগান্তি: ডিএনসিসির তালিকায় ‘মৃত’ কর্মীর ডিউটি!

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম
কাগজে মশক নিধন, বাস্তবে ভোগান্তি: ডিএনসিসির তালিকায় ‘মৃত’ কর্মীর ডিউটি!

রাজধানীতে মশার দাপট এখন চরমে। দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই ঝাঁকে ঝাঁকে কিউলেক্স মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ নগরবাসী। মশা মারতে উত্তর সিটি করপোরেশনের বার্ষিক কয়েক কোটি টাকার বাজেট এবং মশক নিধন কর্মপরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা নড়বড়ে, তার এক বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের তালিকায় আড়াই বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তির নামও এখনো সক্রিয় কর্মী হিসেবে শোভা পাচ্ছে।

মৃত অফর আলীর ভার্চুয়াল ডিউটি
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিরপুর এলাকার মশক নিধন কর্মীদের যে তালিকা ডিএনসিসির ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে, সেখানে ৮ নম্বর ক্রমে নাম রয়েছে অফর আলীর। তালিকায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে, অফর আলীর দায়িত্ব হলো সপ্তাহের প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাগুফতা আবাসিক এলাকা এবং বেগুনটিলা বস্তিতে মশার ওষুধ ছিটানো।

কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে সাগুফতা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন দৃশ্য। নির্ধারিত সময়ে কোনো কর্মীর দেখা মেলেনি। তালিকায় দেওয়া অফর আলীর মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ওই এলাকার সুপারভাইজার রকিবুল আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সুপারভাইজার স্বীকার করেন, অফর আলী প্রায় আড়াই বছর আগেই মারা গেছেন। অথচ সিটি করপোরেশনের অফিশিয়াল ডাটাবেজ বা ওয়েবসাইটে আড়াই বছর ধরে এই তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি।

তদারকির অভাব ও সাধারণের ক্ষোভ
মশা নিধন কার্যক্রম কেবল ওয়েবসাইটের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা। সাগুফতা ও স্বপ্ননগর এলাকার বাসিন্দারা জানান, কয়েল বা স্প্রে দিয়েও এখন আর মশা তাড়ানো যাচ্ছে না। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জাকির সরকার বলেন, মশার অত্যাচারে বাচ্চাদের পড়ার টেবিলে বসানো দায় হয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশনের কোনো তদারকি আছে বলে মনে হয় না।

একই অভিযোগ উত্তরের অভিজাত এলাকা উত্তরার বাসিন্দাদেরও। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, করপোরেশনের কর্মীরা ওষুধ ছিটানোর চেয়ে ছবি তোলা এবং হাজিরা নিশ্চিত করতেই বেশি আগ্রহী। তাদের কাজ মূলত লোকদেখানো।

মশা নিধনের বাস্তব চিত্র (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
মিরপুর সাগুফতা এলাকায় কর্মীর অনুপস্থিতি দেখা গেছে এবং তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর এলাকায় মশার কামড়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এবং সেখানে তদারকির চরম অভাব রয়েছে। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে লোকদেখানো কার্যক্রম চলছে, যেখানে কর্মীরা ছবি তুলে চলে যায় কিন্তু ওষুধ ছিটায় না। সামগ্রিকভাবে ঢাকা উত্তরে মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এক মাসে মশা বেড়েছে শতকরা ৪০ ভাগ।

ডিএনসিসির ভাষ্য ও সমন্বিত সংকটের অজুহাত
ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে ওয়েবসাইট হালনাগাদ না করার কারণে এই অসংগতি তৈরি হয়েছে। তবে মশা বাড়ার পেছনে তিনি কেবল ওষুধ ছিটানোকেই একমাত্র সমাধান মনে করছেন না। তাঁর মতে, বর্তমানে কিউলেক্স মশা বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। নালা-নর্দমায় ময়লা জমে পানির প্রবাহ বন্ধ থাকায় লার্ভা দ্রুত ছড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করেন, বর্তমান মশা সংকটের মূলে রয়েছে স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে তদারকিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এখনই যদি নালা-নর্দমা পরিষ্কার করে লার্ভিসাইডিং করা না হয়, তবে এই পরিস্থিতি মহামারি রূপ নিতে পারে।

দায় কার?
মশা মারতে কোটি টাকার কামান বা ফগিং মেশিন কেনা হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান থাকলেও আড়াই বছর আগে মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকা ডিএনসিসির প্রশাসনিক শৈথিল্যকেই তুলে ধরে। নগরবাসী এখন কেবল ডিজিটাল তালিকা নয়, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত মশক নিধন কার্যক্রমের প্রতিফলন চায়।

জেএইচআর