মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

অফিসে সকাল ৯টা থেকে ৪০ মিনিট ডেস্কে থাকা বাধ্যতামূলক

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
অফিসে সকাল ৯টা থেকে ৪০ মিনিট ডেস্কে থাকা বাধ্যতামূলক

জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে এবং দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এখন থেকে দেশের সকল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রতিদিন সকালে অফিসে পৌঁছে অন্তত ৪০ মিনিট বাধ্যতামূলকভাবে নিজ নিজ আসন বা ডেস্কে অবস্থান করতে হবে। 

মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত এক কঠোর পরিপত্রের মাধ্যমে এই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রশাসনের তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত কাজের গতিশীলতা এবং স্বচ্ছতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যে, অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে আসার পথে ব্যক্তিগত কাজ বা বিভিন্ন সেমিনার-ওয়ার্কশপের দোহাই দিয়ে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকেন না। কেউ কেউ ব্যাংক, হাসপাতাল বা সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বিলম্বে অফিসে আসেন, যার ফলে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন।

এই বিশৃঙ্খলা দূর করতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ‘সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট’ পর্যন্ত সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পরিপত্র অনুযায়ী, এই ৪০ মিনিট কোনো কর্মকর্তা তাঁর কক্ষ বা ডেস্ক ত্যাগ করতে পারবেন না। এমনকি দাপ্তরিক অন্যান্য সভা বা কর্মসূচিও এমনভাবে সাজাতে হবে যেন এই শুরুর সময়টুকুতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

যেখানে নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা ও প্রস্থান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান ভিত্তি। জনসেবা নিশ্চিত করতে হলে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কেবল হাজিরা খাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং তাঁদের ডেস্কে সশরীরে উপস্থিতি অপরিহার্য।

এই নির্দেশনা কেবল সচিবালয়ের জন্য নয়, বরং দেশের সকল স্তরের প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর হবে। সকল সরকারি দফতর ও অধিদপ্তর, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও আধা স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সকল কর্পোরেশন ও সংস্থাতে কার্যকর হবে।

প্রশাসনের কিছু বিশেষ খাত এবং জরুরি সেবার কথা বিবেচনা করে এই পরিপত্রে কিছু ক্ষেত্রকে শিথিলতা প্রদান করা হয়েছে। 

যেসব শিক্ষক বা অনুষদ সদস্য সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্বে নেই, তাঁদের ওপর এই ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

হাসপাতাল, জেলখানা, গণমাধ্যম (সংবাদপত্র ও টিভি) এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সংস্থায় যাঁরা শিফট বা রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। সরাসরি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী সদস্য এবং জরুরি গ্রাহকসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা।

অফিস চলাকালীন হুটহাট কর্মস্থল ত্যাগের প্রবণতা বন্ধে পরিপত্রে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অফিস কক্ষ ত্যাগ করা যাবে না। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রকে ‘বিশেষ বিবেচনায়’ রাখা হয়েছে। 

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বা প্রটোকল প্রদানের ক্ষেত্রে, বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া, উন্নয়ন সহযোগী দেশ বা বিদেশি মিশনের সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনির্ধারিত সভা ও আগে থেকে মঞ্জুরকৃত সরকারি সফর বা ফিল্ড ভিজিটে বিশেষ বিবেচনা করা হবে।

এই পরিপত্র জারির পর থেকে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে এক ধরনের উদ্দীপনা এবং সচেতনতা দেখা দিয়েছে। সাধারণ নাগরিকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতার মতে, ‘সকালে গিয়ে অনেক সময় বড় বাবুদের পাওয়া যায় না। এখন এই নিয়ম চালু হলে অন্তত কাজের শুরুটা দ্রুত হবে।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ‘গোল্ডেন ৪০ মিনিট’ থিওরি যদি সফলভাবে কার্যকর হয়, তবে দিনের শুরুতেই ঝুলে থাকা ফাইলগুলোর নিষ্পত্তি হবে এবং দাপ্তরিক জট কমবে। এটি মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ‘অফিস কালচার’ তৈরির প্রচেষ্টা, যেখানে জনগণের সময়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিভাগীয় প্রধানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তাঁরা নিয়মিতভাবে নিজ নিজ অধীনস্থ দফতরে এই উপস্থিতির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন। ডিজিটাল হাজিরা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে এই নিয়ম প্রতিপালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা হবে।

সরকারি চাকরি কেবল একটি পদবি নয়, বরং এটি জনগণের সেবা করার একটি মহান দায়িত্ব। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই নতুন পরিপত্র সেই দায়িত্ববোধকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের এই কঠোর অবস্থান বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গতিশীলতার পথে এই যাত্রা যদি সফল হয়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক সুফল ভোগ করবে দেশের মানুষ।

এএন