স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে দায়েরকৃত মামলাগুলোর ‘ফিল্টারিং’ করা হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে দায়েরকৃত মামলাগুলোর ‘ফিল্টারিং’ করা হবে
ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আজ বুধবার জেলা প্রশাসক সম্মেলনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি : সংগৃহীত

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দায়ের করা মামলাগুলোর জট খুলতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এক বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে দায়ের হওয়া বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো এখন জেলাভিত্তিক যাচাই-বাছাই করা হবে। 

সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধীরা যেন আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে।

বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের শেষ দিনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত অধিবেশন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সালাহউদ্দিন আহমদ‘সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত সারা দেশে অসংখ্য মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ হচ্ছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংশ্লিষ্ট মামলা। এই মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং আসামিদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ তালিকা চাওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আমরা জেলাওয়ারি মামলার তথ্য চেয়েছি। বিশেষ করে বড় মহানগরগুলোতে মামলার সংখ্যা অনেক বেশি, যেখানে শত শত এমনকি হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক আসামির মধ্যে কারা প্রকৃত অপরাধী আর কাদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়েরকৃত অনেক মামলায় ‘গণ-আসামি’ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এজাহারে নাম থাকলেও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কোনো প্রাথমিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি নিরসনে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই উদ্যোগের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যাদের নাম মামলায় জড়ানো হয়েছে, তাদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিষ্কৃতি দেওয়া।

মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে মামলাগুলো দ্রুত 'ডিসপোজড' বা নিষ্পত্তি করা হবে, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত না হয়। তদন্ত কর্মকর্তারা যাতে চাপের মুখে না পড়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।

মামলাগুলোর তথ্য পাঠানোর জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দিষ্ট কোনো কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া না হলেও, মৌখিকভাবে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে যদি কোনো জেলার তথ্য আসতে কিছুটা দেরিও হয়, তবে তা বিবেচনা করা হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি যেন 'যথাশিগগির' সম্পন্ন হয়, সেদিকেই নজর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে। এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনার পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সেই উত্তাল সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় কয়েক হাজার মামলা দায়ের হয়েছিল, যা বর্তমান বিচার ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণহত্যা মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই ঘটনায় একাধিক থানায় মামলা হয়েছে এবং আসামির তালিকায় শত শত নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার মনে করছে, এই বিপুল সংখ্যক আসামির বিচার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হলে এখনই ‘স্ক্রিনিং’ বা যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।

ডিসি সম্মেলনের এই অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। মামলার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ডিসিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের নিজস্ব পর্যালোচনার ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ চিত্র সরকারের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আইন বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ঢালাওভাবে মামলার সংস্কৃতি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটি দীর্ঘদিনের ক্ষত। যদি প্রকৃত তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধীদের নাম বাদ দেওয়া যায়, তবে প্রকৃত দোষীদের সাজা নিশ্চিত করা সহজ হবে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আশা করছে, যাচাই-বাছাইয়ের নামে যেন কোনো প্রভাবক বা অপরাধী পার পেয়ে না যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আমরা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিচার চাই, কিন্তু সেই বিচারের নামে যেন কোনো নতুন অবিচার না হয়। প্রকৃত অপরাধী যেই হোক, তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

এএন