দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে পর্যায়ক্রমে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অনির্দিষ্টকাল ধরে সেনাবাহিনীকে মাঠ পর্যায়ে রেখে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় এবং এটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যও নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীর বর্তমান অবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীকে পুনরায় সুশৃঙ্খল এবং কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসা এবং বাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়াকে তিনি একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং জনবান্ধব। জনগণের মধ্যে পুলিশকে নিয়ে যে ভীতি বা অনাস্থা ছিল, তা কাটিয়ে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে আসা সেনাবাহিনীকে এখন ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে।
সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টি রাতারাতি ঘটবে না বলে সতর্ক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এই প্রত্যাহার কার্যক্রম কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়মিত সমন্বয় করছে। একটি সুপরিকল্পিত এবং সমন্বিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হবে যাতে আইনশৃঙ্খলার কোনো অবনতি না ঘটে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ধাপে ধাপে এগোব। যেসব এলাকায় পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এককভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম, সেখান থেকেই প্রথমে প্রত্যাহার শুরু হবে। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।
সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দাগী আসামি, মাদক ব্যবসায়ী, অবৈধ অস্ত্রধারী এবং জুয়াড়িদের গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এবং সঠিক তালিকা প্রণয়ন করে এই অভিযানগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী কোথাও যৌথ বাহিনী আবার কোথাও এককভাবে পুলিশ বা র্যাব অভিযান চালাচ্ছে। এসবের ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ অনুভব করতে পারছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আজকের বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সিলেট বিভাগের পাথর কোয়ারিগুলো নিয়ে উদ্ভূত সংকট নিরসন। পরিবেশ আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করে কীভাবে সীমিত পরিসরে পাথর উত্তোলন করা যায়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, 'ইকোলজিক্যালি ক্রিটিকাল এরিয়া' বা পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকাগুলোকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে পাথর কোয়ারি ইজারা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। এই লক্ষ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত ও জরিপ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন যে, চলতি মাসের শেষ নাগাদ এই কমিটির বিস্তারিত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ের হাতে আসবে। এরপর আগামী জুন মাসে আরেকটি ফলো-আপ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে পাথর আহরণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের চূড়ান্ত নীতিমালা নির্ধারণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঘোষণা থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশ ধীরে ধীরে একটি সম্পূর্ণ বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে ফিরে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রশংসা করার পাশাপাশি বেসামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। একই সাথে সিলেটের পাথর কোয়ারি নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব সমাধানের পথে হাঁটা সরকারের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা, এই পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় যেন নিরাপত্তার কোনো ফাঁক না থাকে এবং পুলিশ বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব শতভাগ নিরপেক্ষতার সাথে পালন করতে পারে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন