কোরবানির পশুর হাট

ঢাকার দুই সিটিতে পশুর হাটের চূড়ান্ত প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
ঢাকার দুই সিটিতে পশুর হাটের চূড়ান্ত প্রস্তুতি

আর মাত্র কিছুদিন পরেই উদযাপিত হতে যাচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। এই কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় পশুর হাট বসানোর জোরদার প্রস্তুতি শুরু করেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। ইতিমধ্যে হাটের জায়গা নির্ধারণ, ইজারা প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। 

সারা দেশের প্রান্তিক খামারি, সাধারণ চাষি ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা তাদের লালন-পালন করা গবাদিপশু নিয়ে ঢাকার হাটে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও তাদের মনে ভালো লভ্যাংশের আশার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পথিমধ্যে চাঁদাবাজি, মহাসড়কে হয়রানি এবং হাটের দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ। 

খামারিদের প্রত্যাশা, প্রশাসন যদি এবার কঠোরভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই তারা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য ঘরে তুলতে পারবেন।

১. ঢাকার দুই সিটির পশুর হাট, ইজারা ও চূড়ান্তকরণের সর্বশেষ চিত্র

আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় পশুর হাট বসানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও যাবতীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। তবে ইজারা প্রক্রিয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞাপিত সবকটি হাট এখনও চূড়ান্ত না হলেও সিংহভাগ হাটের ইজারা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। কোরবানি পশু কেনাবেচা যাতে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয় এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) দায়িত্বশীল সূত্র ও তথ্য অনুযায়ী, ডিএসসিসি এলাকার অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য শুরুতে মোট ১১টি স্থানের নাম উল্লেখ করে পেপারে ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। 

তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মতে, এর মধ্যে '৯টি পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি থাকা ২টি পশুর হাটও দ্রুততম সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। 

পশুর হাট সংলগ্ন নির্ধারিত এলাকার চূড়ান্ত হওয়া হাটগুলোতে যাতে কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ না হয় এবং মূল সড়কগুলোতে যেন যানজটের সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে ইজারাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী গাবতলীর স্থায়ী পশুর হাট ছাড়াও বেশ কিছু অস্থায়ী হাট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ প্রথমে মোট ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য পেপারে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। 

সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি পশুর হাটের মধ্যে অস্থায়ী ১০টি ও ১টি স্থায়ী হাট চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে উত্তর সিটি কর্পোরেশ।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাটগুলোতে ডিজিটাল পেমেন্ট বুথ, ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য পর্যাপ্ত আলো ও পানির ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।

২. দেশের পশুর পর্যাপ্ত জোগান: আমদানিমুক্ত দেশীয় বাজার

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এবার কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না। বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত গবাদিপশু দেশে প্রস্তুত রয়েছে।

চাহিদা ও জোগানের পরিসংখ্যান: ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর সারা দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ । এর বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরে খামারি ও সাধারণ কৃষকদের গোয়ালে প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখেরও বেশি গবাদিপশু। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২  লাখেরও বেশি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে।

দেশীয় পশুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণতা: সম্পূর্ণ দেশীয় ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গবাদিপশু দিয়ে এবার দেশের শতভাগ কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাইরে থেকে কোনো পশু আমদানির প্রয়োজন নেই বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এতে দেশীয় খামারিরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

অনলাইন পশুর হাটের জনপ্রিয়তা: গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ডিজিটাল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পশু কেনাবেচার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শতভাগ দেশীয় ও অর্গানিক উপায়ে মোটাতাজা করা গরুর ছবি ও ভিডিও দেখে ঘরে বসেই অনেকে অর্ডার নিশ্চিত করছেন। এটি হাটের ভিড় কমানোর পাশাপাশি একটি আধুনিক ও ঝামেলামুক্ত বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

 ৩. খামারিদের স্বপ্ন ও মূল দুশ্চিন্তা: মহাসড়ক ও হাটের চাঁদাবাজি

সারা দেশের লাখ লাখ খামারি ও সাধারণ চাষিদের জন্য কোরবানি ঈদ হলো বছরের প্রধান আয়ের উৎস। একটি গরুকে সুস্থ ও মোটাতাজা করতে তাদের সারা বছর অক্লান্ত পরিশ্রম, রাত জাগা যত্ন এবং উচ্চ মূল্যের দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হয়। এই পশুর বিক্রিলব্ধ অর্থ দিয়েই তাদের সারা বছরের সংসার খরচ, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরবর্তী বছরের খামারের পুঁজি সংস্থান হয়।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছরই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর থেকেই খামারিদের নানা ধরণের ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। তাদের মূল দুশ্চিন্তার বড় কারণগুলো হলো,

পরিবহন পথে চাঁদাবাজি: দেশের দূরদূরান্ত (যেমন: কুষ্টিয়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর) থেকে ট্রাকে করে পশু নিয়ে আসার সময় বিভিন্ন মহাসড়কে, ফেরিঘাটে কিংবা সেতুর টোল প্লাজার আশেপাশে এক শ্রেণীর অসাধু চক্র ও নামধারী বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অবৈধ চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে গাড়ি আটকে রাখা বা চালকদের মারধরের ঘটনাও ঘটে।

হাটের ভেতরে হয়রানি ও হাসিল জালিয়াতি অনেক সময় হাটে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালাল চক্রের খপ্পরে পড়তে হয় বিক্রেতাদের। নির্ধারিত হাসিলের চেয়ে বেশি টাকা আদায় করার চেষ্টা এবং কৃত্রিমভাবে ভালো স্থানগুলো দখল করে রাখার কারণে প্রান্তিক খামারিরা চরম বিপাকে পড়েন।

জাল টাকার দৌরাত্ম্য, কোরবানির হাটে কোটি কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়। এই সুযোগে জাল টাকা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরল-সোজা খামারিদের ধোঁকা দিয়ে জাল নোট ধরিয়ে দেওয়ার ভয় খামারিদের সবচেয়ে বেশি তাড়া করে।

৪. সংকট উত্তরণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা

খামারিদের এই গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এবার বিশেষ ও কড়া নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মহাসড়ক, নৌপথ এবং পশুর হাটগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার জন্য পুলিশ, র‍্যাব, হাইওয়ে পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ক) জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর মনিটরিং

সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পশুবাহী ট্রাকে বা রাস্তায় কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না। মহাসড়কে কোনো পশুবাহী গাড়ি নির্দিষ্ট কোনো হাটে যাওয়ার জন্য কেউ জোরপূর্বক থামাতে পারবে না। ব্যবসায়ী বা খামারিরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো হাটে পশু নিয়ে যেতে পারবেন। যদি কোনো স্পটে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায়, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খ) হাটে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ

ঢাকার প্রতিটি হাটে পর্যাপ্ত পুলিশ ক্যাম্প এবং ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি অনুমোদিত পশুর হাটে বিনামূল্যে 'জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ' স্থাপন করা হবে। খামারি বা ক্রেতারা যেকোনো বড় অঙ্কের নোট সন্দেহ হলে এই বুথগুলো থেকে পরীক্ষা করে নিতে পারবেন। একই সাথে হাটের ভেতরে কোনো প্রকার কৃত্রিম সংকট তৈরি বা ইজারাদারদের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত হাসিল আদায় বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

গ) পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ভেটেরিনারি টিম

কোরবানির পশুগুলো যাতে সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকে, সেজন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ঢাকার প্রতিটি হাটে সার্বক্ষণিক মোবাইল ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম বা পশুর ডাক্তার উপস্থিত থাকবেন। কোনো পশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পাশাপাশি স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা পশু শনাক্তে এই টিম কাজ করবে।

ঈদুল আজহার মূল বাণীই হলো ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধি। এই উৎসবের সাথে দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের যে হাটগুলো ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে এবং যেগুলো চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে- সেগুলোর হাট ব্যবস্থাপনা যদি সুচারু হয় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সড়ক ও হাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে খামারিরা তাদের পশুর ন্যায্য মূল্য পাবেন। 

চাঁদাবাজিমুক্ত, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে যেন এ বছরের পশুর হাটগুলো পরিচালিত হতে পারে, সেটাই এখন দেশের সাধারণ ক্রেতা, বিক্রেতা ও খামারিদের একমাত্র বড় প্রত্যাশা। সরকারের নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলোর মাঠপর্যায়ে শতভাগ বাস্তবায়নই পারে এই উৎসবকে সফল এবং খামারিদের মুখে হাসি ফোটাতে।

এএন