পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যা, এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশ আইনমন্ত্রীর

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যা, এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দেশ আইনমন্ত্রীর
নিহত শিশু রামিসা ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (সংগৃহীত ছবি)

রাজধানীর মিরপুর সংলগ্ন পল্লবী এলাকায় মাত্র সাত বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর শরীর খণ্ড-বিখণ্ড করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। 

এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত কার্যক্রমে সর্বোচ্চ গতি আনার জন্য তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।

আইন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড. মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ঘটনাটি জানার পর থেকেই এর আইনি প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। 

ড. করিম বলেন, আইনমন্ত্রী ডিএমপি কমিশনারের সাথে কথা বলেছেন এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছেন। দেশের প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই জঘন্য অপরাধের বিচার যেন কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত না হয়, তা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

ঘটনার নৃশংস পটভূমি, লোমহর্ষক সেই ১৯ মে: মামলার এজাহার এবং পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পল্লবী এলাকার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে এই রোমহর্ষক ও অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। নিহত শিশুটি স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। ঘটনার দিন বিকেলে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ওই অবুঝ শিশুকে একা পেয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়।

সেখানে শিশুটির ওপর পৈশাচিক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ চালানো হয়। ধর্ষণের পর শিশুটি যাতে চিৎকার করতে না পারে এবং ঘটনাটি জানাজানি না হয়, সেই উদ্দেশ্যে সোহেল রানা অত্যন্ত নির্মমভাবে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি এই ঘাতক, নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির কোমল শরীরকে কয়েক টুকরো করে খণ্ড-বিখণ্ড করে। এরপর অবর্ণনীয় নৃশংসতায় রক্তমাখা সেই দেহাংশগুলো ঘরের ভেতরের বাথরুম এবং খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়।

বিকেলের পর থেকে শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যরা এলাকায় সন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে নিখোঁজ শিশুর সন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় সোহেল রানার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ড-বিখণ্ড রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় পুরো পল্লবী এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে আসে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন।

মামলার অগ্রগতি ও আসামিদের বর্তমান আইনি অবস্থা: এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরদিনই অর্থাৎ ২০ মে, নিহত শিশুটির শোকাচ্ছন্ন বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় সোহেল রানাকে এবং এই নৃশংস কাজে সহযোগিতা ও আলামত গোপনের চেষ্টার অভিযোগে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আসামি করা হয়।

মামলা দায়েরের পর পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়। ইতিমধ্যেই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হলে সে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে রাজি হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৬৪ ধারা মোতাবেক ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোহেল রানা নিজের অপরাধের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। 

জবানবন্দিতে সে স্বীকার করেছে কীভাবে সে শিশুটিকে প্রলোভন দেখিয়ে ঘরে এনেছিল, কীভাবে ধর্ষণ করেছে এবং পরবর্তী সময়ে প্রমাণ লোপাটের জন্য লাশ খণ্ড-বিখণ্ড করে বাথরোমে ও খাটের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল।

অন্যদিকে, এই মামলার দ্বিতীয় আসামি এবং সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে পুলিশ আগেই গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করেছিল। আদালত শুনানি শেষে তাকে জামিন না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে স্বপ্না আক্তার জেলহাজতে রয়েছেন এবং এই হত্যাকাণ্ডে তার प्रत्यक्ष বা পরোক্ষ ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

দ্রুত বিচার নিশ্চিতে আইনমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান: বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল অপরাধগুলোর বিচার দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায়শই ব্যাহত হয়, এমন একটি জনআকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের এই তাৎক্ষণিক ও কঠোর নির্দেশনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ধরনের জঘন্য ও পাশবিক অপরাধের ক্ষেত্রে সমাজের অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা যাওয়া প্রয়োজন। যদি দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ শুরু করা যায়, তবে তা সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে প্রতিবন্ধক বা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। আইনমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, তদন্ত প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল বা সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিদিনের শুনানির ভিত্তিতে বিচার পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের (পিপি) বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া: এদিকে পল্লবীর এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাত বছরের একটি নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও পরে কসাইয়ের মতো কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব। তারা এই খুনি দম্পতির, বিশেষ করে মূল হোতা সোহেল রানার দ্রুততম সময়ে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আইনমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ডিএমপি কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেন কোনো ফাঁকফোকর ছাড়াই একটি নিশ্ছিদ্র ও তথ্যপ্রমাণ-নির্ভর তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ দুর্বল চার্জশিটের কারণে অনেক সময় পার পেয়ে যায় মূল অপরাধীরা। যেহেতু প্রধান আসামি ইতিমধ্যেই ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, তাই এই মামলার ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট দ্রুত সম্পন্ন করে নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা পুলিশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ: পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনমন্ত্রীর নির্দেশনার পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এবং ডিবির বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কাজ করছেন। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত, রক্তমাখা কাপড় ও অস্ত্রের ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করার জন্য সিআইডি ফরেনসিক ল্যাব ও সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

সাধারণত ফৌজদারি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও চাঞ্চল্যকর ও জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে চার্জশিট দেওয়ার নজির রয়েছে। পল্লবীর এই ঘটনাটি যেহেতু সমাজকে নাড়া দিয়েছে এবং স্বয়ং আইনমন্ত্রী এর তদারকি করছেন, তাই পুলিশ প্রশাসন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করছে।

নৃশংসভাবে নিহত হওয়া ওই দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুটির পরিবার এখন শুধু একটিই প্রার্থনা করছে, তাদের নিষ্পাপ সন্তানের হত্যাকারীর যেন এমন শাস্তি হয়, যা দেখে আর কোনো অপরাধী কোনো শিশুর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস না পায়। আইনমন্ত্রীর এই তড়িৎ হস্তক্ষেপ ভুক্তভোগী পরিবারটির মনে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা জাগিয়েছে।

এএন/জেএইচআর