জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

চার দশক পর আবারও বিশ্বরাজনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে অনন্য গৌরবের ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে  বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অভিজ্ঞ সাবেক কূটনীতিক খলিলুর রহমান। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শক্তিশালী দেশ সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক পদে নির্বাচিত হন।

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়ে, যার মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট এবং সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ও ভোট গণনা সম্পন্ন হয়। আগামী ১ বছরের জন্য তিনি এই বিশ্বসভার নেতৃত্ব দেবেন।

এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ ছাড়া বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের এই বড় কূটনৈতিক সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন, ভারত ও পাকিস্তান।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধির আসীন হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। তবে দীর্ঘ ৪০ বছর পর এই গৌরব ফিরে পাওয়া দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণের চার দশক পর ২০২৬ সালে এসে আবারও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের হাত ধরে বিশ্বসভার সভাপতির আসনটি অলঙ্কৃত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর গভীর আস্থা, বহুপাক্ষিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের এক অকাট্য প্রমাণ।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই জয় ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ ও কৌশলগত কূটনীতির ফসল। বাংলাদেশ এই পদের জন্য ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে দেশের একক প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ফলে পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা চালানোর জন্য বাংলাদেশ সময় পায় মাত্র তিন মাস।

বিপরীতে, ইউরোপের দেশ সাইপ্রাস এই পদের জন্য ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করেছিল এবং গত এক দশক ধরে তারা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। আপাতদৃষ্টিতে সাইপ্রাস এগিয়ে থাকলেও ঢাকার দক্ষ বহুপাক্ষিক কূটনীতির কাছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল পরাস্ত হয়।

বাংলাদেশের কূটনীতিকেরা জানিয়েছেন, এই অসাধ্য সাধনের মূলে ছিল ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’  বা পারস্পরিক ভোট বিনিময়ের চুক্তি। বাংলাদেশ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিশ্রুতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। 

মাত্র তিন মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, বৈশ্বিক যোগাযোগের নিবিড় নেটওয়ার্ক এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ফোরামগুলোতে অত্যন্ত সক্রিয় ও আগ্রাসী প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন নিজের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়।

নির্বাচনে খলিলুর রহমানের এই একক বিজয়ের পেছনে তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক ক্যারিয়ার অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি কোনো আকস্মিক প্রার্থী ছিলেন না, বরং জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ কর্মপদ্ধতি ও বিশ্ব রাজনীতির অলিগলি তাঁর নখদর্পণে। সাবেক এই পেশাদার কূটনীতিক তাঁর কর্মজীবনের একটি বিশাল অংশ সুইজারল্যান্ডের জেনেভা এবং আমেরিকার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে অতিবাহিত করেছেন।

১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের - আঙ্কটাড বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব সংস্থায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর পর টানা ২৫ বছর ধরে তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন জ্যেষ্ঠ ও নীতি-নির্ধারণী পদে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বই নয়, জাতিসংঘের বহু বিখ্যাত ও বৈশ্বিক নীতি-নির্ধারণী প্রকাশনার প্রধান লেখক হিসেবেও তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ছিলেন। ফলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সদস্য দেশগুলোর কাছে খলিলুর রহমান ছিলেন একজন অত্যন্ত পরিচিত, গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বস্ত মুখ, যা ভোটের মাঠে বাংলাদেশের পক্ষে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বিশেষ বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অসামান্য অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান এবং আমাদের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতারই বাস্তব প্রতিফলন। 

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নবনির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমান অত্যন্ত গর্ব ও দক্ষতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বর্তমান বিশ্বের বহুপাক্ষিক ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সংযোগ স্থাপন, সংলাপের পরিবেশ তৈরি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করবেন।

বাংলাদেশের এই সাফল্যে দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক সাড়া পড়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের দূতাবাস রাতে এক আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পোস্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানায়। চীন তাদের শুভেচ্ছা বার্তায় জানায়, আগামী দিনে বৈশ্বিক অভিন্ন অগ্রাধিকার রক্ষা ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞ প্রতিনিধির সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করতে বেইজিং উন্মুখ হয়ে আছে।

পাশাপাশি, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'এক্স'-এ (সাবেক টুইটার) পৃথক পোস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভকামনা জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। এর পর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ- উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক যেখানে বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর তাদের নিজ নিজ দেশের বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরবেন।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই কূটনৈতিক মহাযজ্ঞের মূল সভাপতির আসনে বসে পুরো অধিবেশন এবং বৈশ্বিক আলোচনা পরিচালনা করবেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান। এক বছরের এই মেয়াদে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-বিগ্রহের অবসান, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা  অর্জন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার রক্ষায় সাধারণ পরিষদের পক্ষ থেকে এজেন্ডা নির্ধারণে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন।

এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সমস্ত সদস্য দেশকে তাদের মূল্যবান ভোট ও সমর্থনের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছে। 

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সর্বদা বৈশ্বিক শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পক্ষে কাজ করে। এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের যে নতুন যুগের সূচনা হলো, তা ধরে রেখে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি, উদ্দেশ্য এবং বৈশ্বিক এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আগের চেয়েও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাইপ্রাসের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি শক্তিশালী দেশের দীর্ঘ ১০ বছরের প্রচারণাকে টেক্কা দিয়ে মাত্র ৩ মাসে বাংলাদেশের এই জয় প্রমাণ করে- সঠিক সময়ে সঠিক কৌশল গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যেকোনো বড় পরাশক্তিকেও চমকে দেওয়া সম্ভব। এই বিজয় আগামী দিনগুলোতে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত ও শক্তিশালী করবে।

এএন