জেলাসি ‘ওথেলো সিনড্রো’ একটি মানসিক রোগ

আবুল বাশার রিপন খলিফা প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৩, ১১:৪২ এএম
জেলাসি ‘ওথেলো সিনড্রো’ একটি মানসিক রোগ
আবুল বাশার রিপন খলিফা। ছবি: ফাইল

Jealousy, "a feeling of unhappiness and anger because someone has something or someone that you want"

Jealousy, এখন আর নাটক সিনেমাতে নয় ঘরে ঘরে মোরে মোরে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে চলে এসেছে। ব্যক্তি ব্যক্তির পিছনে লেগে আছে। যার সম্পদ আছে সে অন্যের সম্পদের পিছনে লেগে আছে। যার ডিগ্রী আছে সে অন্যের ডিগ্রি পিছনে লেগে আছে। যার চেয়ার আছে সে অন্যের চেয়ারের পিছনে লেগে আছে। এই যে লেগে থাকা তার  পিছনের মূল কারণ হলো "জেলাসি" যেটা হিংসা যা মানুষকে নিকৃষ্ট পর্যায়ে  নিয়ে যায়। 

আর এই জেলাসির পিছনের মূল কারণ যেটা সেটি হচ্ছে মূলত "সন্দেহ" যা শেষ পর্যায়ে শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যায়।

মানুষে মানুষে এত জেলাসি কেন! হিংসা হল অন্যের ভালো দেখলে খারাপ লাগা।আপনার বন্ধু,ভাই-বোন,আত্মীয়-স্বজন,প্রতিবেশী যাদের সাথে আপনি চলাফেরা করেন তাদের ভাল দেখলে,উন্নতি দেখলে আপনার যদি খারাপ লাগে,তাহলে বুঝবেন যে আপনি জেলাসিতে ভুগছেন। জেলাসি বা হিংসা একটা কবিরা (বড়) গুনা। পৃথিবীর বুকে এমন মানুষ খুব কমই হবে যার হিংসা নেই,কম-বেশি হিংসা সবার মধ্যেথাকে।আফসোস,আমরা হিংসাকে অপরাধ মনে করিনা যদিও কোরআন পড়লে আমরা জানতে পারি,যে সৃষ্টিজগতের প্রথম গুনাহ ছিল হিংসা যাকে জেলাসি বলা চলে।

কিভাবে এলো এ নাম?

ওথেলো সিন্ড্রোম - প্যাথলজিকাল জেলাসি 

এই সিনড্রোমের নামটি এসেছে বিখ্যাত শেক্সপিয়রীয় নাটক ‍‍`ওথেলো‍‍` থেকে, যেখানে ওথেলো তার স্ত্রীর অবিশ্বাসের প্রতি অত্যন্ত সন্দেহজনক ছিল। 

 Othello Syndrome-এর আরেকটি নাম হল Delusional Disorder – one type of Jealousy  এবং এটি এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। 

এই ব্যাধির লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

✓অন্যের ভালো দেখে নিজের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া এবং অন্য কেউ যেন তার উপরে না যেতে পারে সেজন্য সমস্ত প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রবণতা। যেটি সংক্রমণ রোগের মত প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছড়িয়ে পড়েছে।

✓অবিশ্বস্ত হওয়া বা অন্য লোকেদের খুব বেশি মনোযোগ দেওয়ার জন্য অবিচ্ছিন্নভাবে অংশীদারকে অভিযুক্ত করা তাদের গোপনীয় বিষয়ে আক্রমন।

✓ "প্রমাণ" খোঁজা খোঁজি করা যে আমি তার পেছনে পড়ে যাচ্ছি অতএব তাকে পিছনে ফেলাতেই হবে। সেজন্য তার দুর্বলতা গুলাকে খুঁজে খুঁজে বের করে যেন সমাজে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা। চায় তাদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কই থাকুক না কেন? বন্ধু বান্ধবীর সম্পর্ক থাকুক না কেন? দুইজন একে অপরের সহকর্মী হোকনা বা কেন?

 ✓অনেক সময় এরূপটির এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে ,শৈশবকালীন ট্রমা, যেখানে ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির শৈশবকালে তাদের আপনজনদের  সাথে একটি অস্থির সম্পর্ক ছিল, বা তাদের পারিবারিক সমস্যা ছিল যেখানে  পিতামাতা অন্যের প্রতি অবিশ্বস্ত ছিলেন।  

✓এটি প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস এবং অস্থিরতার অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।  যেটিকে অ্যাটাচমেন্ট ডিসঅর্ডার হিসাবে অনেক সময় সংজ্ঞায়িত করা হয়। 

✓ওথেলো সিন্ড্রোমের আরেকটি কারণ হতে পারে এবং এটি কর্মস্থলে এক অপরের সাথে খারাপ ব্যবহার বা তাদের একে অপরের দোষ খোঁজা,

 মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন। 

✓অনেক সময় এই রোগটিকে অনিরাপদ সংযুক্তি প্যাটার্ন দ্বারাও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।  ব্যক্তির নিম্ন আত্মসম্মান (পদ পদবী, জ্যেষ্ঠতা) ইত্যাদি ইত্যাদি। যার ফলস্বরূপ  তারা তাদের ঈর্ষার ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে  নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ করিয়া থাকেন।

✓ ওথেলো সিনড্রোম, এটিতে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তাদের প্রতিপক্ষ এর জন্যও একটি খুব কষ্টদায়ক ব্যাধি হতে পারে।  এটি আক্রান্ত ব্যক্তি সমূহের  জীবনযাত্রার মানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে এবং সম্পর্কের মধ্যে উচ্চ উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদী  অস্বাস্থ্যকর জীবনের একটি বহিঃপ্রকাশ। একসময়ে ঐ  ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ সুইসাইডাল অ্যাক্টিভিটির দিকে ধাবিত হয়। বড় বড় পর্যায়ে সামাজিক অবক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধবিগ্রহের দিকেও ধাবিত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে জেলাসি। 

✓ইবলিশ, আদম (আ.) এর সম্মান দেখে হিংসার বশে তাকে সেজদা করে নাই, যদিও সে জানতো যে তার ক্ষমতা, জ্ঞান, দক্ষতা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, তাও সে আল্লাহর নাফরমানি করেছিল।

✓বর্তমান বিশ্বের পরতে পরতে এই জেলাসি এমনভাবে ফাঁদ পেতে ফেলেছে যে মানুষ মানুষের জন্য না হয়ে মানুষ মানুষের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। 


✓এই ধরুন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এটি এমনই প্রকট আকার ধারণ করেছে, যে বহু মানুষের অধিকার নষ্ট হচ্ছে। কোন ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের এই জেলাসির কারণে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অচল হয়ে যাচ্ছে।

✓আমাদের সমাজে যারা ব্যভিচার, যেনা, মদ খাওয়া এসবের মতো হারাম কাজে লিপ্ত থাকে তাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া শয়তানের জন্য একদম সহজ। কিন্তু আমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর খাঁটি বান্দা যে, নামাজ, রোজা সবই রাখে, দাড়ি রাখে, সুন্নত মানে তাদেরকে শয়তান কিভাবে জাহান্নামে নিয়ে যাবে? তাদের জন্য শয়তান জেলাসি কে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন-

তোমরা অবশ্যই হিংসা পরিহার করবে। কারণ, আগুন যেভাবে কাঠকে বা ঘাসকে খেয়ে ফেলে তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমল কে খেয়ে ফেলে। (সুনানে আবু দাউদ:৪৯০৩)

মানুষের মনে এত হিংসা কেন? 

কেন তারা অন্যের উন্নতি চায় না? হিংসা, হল অন্যের ভালো দেখলে খারাপ লাগা। আপনার বন্ধু, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী যাদের সাথে আপনি চলাফেরা করেন তাদের ভাল দেখলে, উন্নতি দেখলে আপনার যদি খারাপ লাগে, তাহলে বুঝবেন যে আপনার হিংসে আছে।

✓আফসোস, আমরা এই জেলাসিকে অপরাধ মনে করিনা যদিও মহাগ্রন্থ আল-কোরআন পড়লে আমরা জানতে পারি,যে সৃষ্টিজগতের প্রথম গুনাহ ছিল জেলাসি। ইবলিশ, আদম (আ.)এর সম্মান দেখে হিংসার বশে তাকে সেজদা করে নাই, যদিও সে জানতো যে তার ক্ষমতা, জ্ঞান, দক্ষতা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, তাও সে আল্লাহর নাফরমানি করেছিল।

জেলাসির কুফল গুলো হলো-

✓তোমরা অবশ্যই জেলাসিকে পরিহার করবে। কারণ, আগুন যেভাবে কাঠকে বা ঘাসকে খেয়ে ফেলে তেমনি হিংসাও মানুষের নেক আমল কে খেয়ে ফেলে। (সুনানে আবু দাউদ:৪৯০৩)

✓হিংসে অনেকটা ছাই এর স্তুপের মতো, এই ছাই এর স্তুপ দেখতে অনেক বড় মনে হয় কিন্তু হালকা বাতাস আসতেই তা বিলীন হয়ে যায়। আমার নিজের চোখে দেখা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ একে অপরের প্রতি জেলাস ছিলেন একটি সময় ওই ব্যক্তিরা  তরুপের তাসের মতো হারিয়ে গেছে।

আপনি সারা জীবন অনেক কষ্ট করে ভালো কাজ করলেন, কিন্তু জেলাসি আপনার কাজকে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে দিল।

✓ বিভিন্ন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের কথাবার্তা থেকে জানা যায় বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গ অধিক পরিমাণে জেলাস ছিলেন অর্থাৎ হিংসুক ছিলেন তারা সেই হিংসে করে কোনদিনও কারো ক্ষতি করতে পারেনি বরঞ্চ নিজে সে হিংসে করে অকারনে দিন-রাত দুশ্চিন্তা করে, তার অন্তর জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যায়, সে তার কোন কিছুতে সন্তুষ্ট হয় না, এভাবেই সে তার দুনিয়া এবং আখিরাত দুটোই নষ্ট করে ফেলে।

উত্তরণের উপায় কি

✓একটা কথা মনে রাখবেন, আল্লাহ যার জন্য যা ভালো মনে করেন তাকে তাই দেন, ব্যবসায় একজনের লাভ আপনার চেয়ে বেশি হল, অথবা অন্য কোন ভাবে সে আপনার চেয়ে এগিয়ে গেল, তা কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছেতেই হয়েছে। একজন ব্যক্তি উপাচার্য মহোদয়ের খুব কাছের তাকে দেখে অনেকের মাঝে জেলাসি জাগ্রত হয় । সেখান থেকে সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে তা শত্রুতাতে রূপান্তর হয়। যার বহিঃপ্রকাশ  স্বচক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও আপনারা দেখছেন। 

যখন আপনি হিংসা করেন তখন আপনি আল্লাহর ফয়সালা কে একপ্রকার অস্বীকার করেন,অর্থাৎ কুফরী করেন যা অত্যন্ত জঘন্য কাজ।

✓আপনি হিংসে করার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করতে পারেন যে, “আল্লাহ তুমি তাকে দিয়েছো তোমার ভান্ডারে তো কোন কমতি নেই, ইয়া আল্লাহ তাকে যেমন দিয়েছো আমাকেও দাও” এটাকে ঈর্ষা(Envy) বলে যা হিংসার(Jealousy)মত নিন্দনীয় নয়।

✓উপরোক্ত দোয়া করার পরেও যদি কাজ না হয় তাহলে, এবার আপনি আপনার নফসের/মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখ থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন সে ব্যক্তির জন্য হে আল্লাহ, “আপনি ওকে দিয়েছেন তার জন্য শুকরিয়া, আল্লাহ আপনি ওকে আরো দিন।”

আসুন সবাই মিলে একে অপরের বন্ধু হয়ে সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরের উপকার করার চেষ্টা করি হিংসা বিদ্বেষ পরিত্যাগ করি। তবেই একটি প্রতিষ্ঠান, একটি পরিবার, একটি ব্যক্তি রাষ্ট্র, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড  সুন্দর স্বর্গীয় স্থানে পরিণত হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এআরএস