ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির নেতা ও সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অংশ হচ্ছেন না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মধ্যে যে নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা হয়েছে, সেখানে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মাহফুজ আলম তার এই অবস্থানের কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জামায়াত,এনসিপি জোট থেকে তাঁকে ঢাকা,১২ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে লড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হতে চান না।
মাহফুজ আলম এনসিপি এবং নাগরিক কমিটির গঠনের সময় থেকেই তাদের নীতিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণ শক্তির একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এনসিপিকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের ইতি টানার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এনসিপিকে একটা ‘জুলাইয়ের বড় ছাতা’ হিসেবে স্বতন্ত্র উপায়ে দাঁড় করানোর জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু অনেক কারণেই সেটা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির এই কৌশলগত নির্বাচনী সমঝোতা অনেক ত্যাগী ও আদর্শিক ছাত্রনেতার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। মাহফুজ আলমের এই প্রস্থান এনসিপির জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ দলটির নীতি নির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম।
মাহফুজ আলমের পোস্টে বেশ কিছু গভীর রাজনৈতিক দর্শনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটি ‘শীতল যুদ্ধ’ বা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে কোনো নির্দিষ্ট ক্ষমতা বলয়ের বা জোটের পক্ষ না নিয়ে নিজের নীতিতে অটল থাকাই শ্রেয় বলে তিনি মনে করেন।
তার এই অনীহার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে কোনো নির্দিষ্ট পুরনো ধারার রাজনৈতিক দলের সাথে মিলিয়ে না ফেলে স্বতন্ত্র সত্তা রক্ষা করা। তিনি বারবার নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছেন, যা প্রথাগত জোটবদ্ধ রাজনীতির মাধ্যমে অর্জন করা কঠিন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। এ ছাড়া কেবল ক্ষমতা দখল নয়, বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
উল্লেখ্য যে, মাহফুজ আলম একা নন; জামায়াতের সঙ্গে এই নির্বাচনী সমঝোতার সিদ্ধান্তে এনসিপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সংগঠক আগে থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। ইতিমধ্যে অনেক নেতা দল ছেড়েছেন অথবা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। মাহফুজের এই প্রকাশ্য ঘোষণা এনসিপির অভ্যন্তরীণ ভাঙন বা আদর্শিক দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।
নির্বাচনী রাজনীতি থেকে আপাতত দূরত্ব বজায় রাখলেও, মাহফুজ আলম আশাবাদী যে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে একটি মধ্যপন্থী ও বিকল্প তরুণ শক্তির উত্থান ঘটবে। তিনি বলেন, গত দেড় বছর ধরে তিনি যে নীতিতে বিশ্বাস রেখেছেন, তা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে অব্যাহত রাখবেন। তিনি একটি ‘দায়-দরদের সমাজ’ এবং ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা’ করার যে ডাক দিয়েছিলেন, সেই পথে কেউ তাঁর সঙ্গে হাঁটতে চাইলে তাঁকে স্বাগত জানাবেন বলেও উল্লেখ করেন।
মাহফুজ আলম এখন আর এনসিপির অংশ নন। তিনি জামায়াত,এনসিপি জোটের হয়ে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন, কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর সম্মান ও স্নেহ অটুট থাকলেও রাজনৈতিক পথ এখন আলাদা। তাঁর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য হলো নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তিনি বর্তমান বাংলাদেশকে একটি ‘শীতল যুদ্ধের’ মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশ হিসেবে দেখছেন।
মাহফুজ আলমের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন এবং ছাত্র নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। প্রথাগত জোটের বাইরে থেকে তিনি কীভাবে তাঁর নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতি এগিয়ে নেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন