আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, রাজধানীর ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ততই তুঙ্গে উঠছে। এই আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস এবং ১১-দলীয় ঐক্যজোটের তরুণ তুর্কি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে লড়াই এখন কেবল ভোট চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক তপ্ত বাক্যযুদ্ধে। ‘অভিজ্ঞতা’ বনাম ‘পরিবর্তনের’ এই দ্বৈরথে দুই প্রার্থীই একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তূণ ছুড়ছেন।
রোববার সকাল থেকে রাজধানীর খিলগাঁও ও শাহজাহানপুর এলাকায় গণসংযোগকালে দুই প্রার্থীর বক্তব্যে উঠে এসেছে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাত।
সকালে খিলগাঁও এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তরুণ প্রার্থীদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, নির্বাচনী মাঠে কিছু বাচ্চা ছেলে নেমেছে যারা অত্যন্ত বেসামাল কথাবার্তা বলছে। এদের কথা শোনাটাই এখন বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছে আমরা তাদের কাছে রাজনীতি শিখব, কিন্তু সেই প্রয়োজন আমাদের নেই।
মির্জা আব্বাস আরও অভিযোগ করেন যে, কিছু প্রার্থীর নিজস্ব কোনো নির্বাচনী ইশতেহার বা জনসেবার পরিকল্পনা নেই। তাঁর ভাষায়, কিছু প্রার্থীর মুখে দিনরাত শুধু আমারই নাম। তারা জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার চেয়ে আমার বিরুদ্ধে অনর্গল বিষোদগার করতেই বেশি ব্যস্ত। খিলগাঁও-শাহজাহানপুর আমার ঘর, এখানকার মানুষ জানে কারা উন্নয়ন করেছে আর কারা আওয়ামী লীগের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কেবল নাটক করছে।
মির্জা আব্বাসের ‘অর্বাচীন’ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন ১১-দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রচারণাকালে তিনি মির্জা আব্বাসের নাম উল্লেখ না করে বলেন, "যখনই আমরা দেশের মৌলিক সমস্যা, দুর্নীতি আর পেশিশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলি, তখনই এই রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের অংশ হওয়া ব্যক্তিরা আমাদের ওপর চটে যান। তারা আমাদের বেয়াদব বা অর্বাচীন বলেন। কিন্তু একজন গ্যাংস্টার, চাঁদাবাজ কিংবা দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যখন সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন চুপ থাকাটাই হবে জাতির সাথে বেঈমানি।
পাটওয়ারী আরও যোগ করেন, শেখ হাসিনাও আমাদের অনেক কথা বলেছিলেন যখন আমরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। আজ যারা নিজেদের অভিজ্ঞ দাবি করছেন, তারাও সেই একই কায়দায় আমাদের কণ্ঠরোধ করতে চান। আমরা বিষোদগারের রাজনীতি করি না, আমরা সত্যের রাজনীতি করি। কালো টাকা আর পেশিশক্তির দাপট দেখিয়ে নির্বাচনে জেতার দিন শেষ হয়ে আসছে।
ঢাকা-৮ আসনটি (রমনা-মতিঝিল-শাহজাহানপুর) বরাবরই মর্যাদাপূর্ণ। মির্জা আব্বাস এই আসনে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ এবং তাঁর একটি শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। তবে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নতুন এক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই ‘প্রজন্ম বনাম অভিজ্ঞতার’ লড়াই নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এলাকার প্রবীণ ভোটাররা মির্জা আব্বাসের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর ভরসা রাখলেও তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সাহসী বক্তব্যের দিকে ঝুঁকছে। শাহজাহানপুর এলাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, আব্বাস ভাই এলাকার লোক, বিপদে-আপদে তাকে পাওয়া যায়। তবে পাটওয়ারী সাহেব যেসব দুর্নীতির কথা বলছেন, সেগুলোও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। লড়াইটা এবার হবে সমানে সমান।
ঢাকা-৮ আসনে এই বাগযুদ্ধ কেবল ভোটের লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ধারাক্রম কোন দিকে যাবে সেটিরই এক ছোট মহড়া। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার জয় হয় নাকি তারুণ্যের দ্রোহ আসনটি ছিনিয়ে নেয়, তার ফয়সালা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন