ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘূর্ণির জাদুতে ভর করে দুর্দান্ত এক জয় পেল বাংলাদেশ। ১৭৯ রানের বিশাল ব্যবধানে টাইগারদের এই জয় ওয়ানডে ক্রিকেটে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে জয়। একই সঙ্গে ১৭ মাস পর জিতল কোনো ওয়ানডে সিরিজ।
এ যেন দীর্ঘদিনের দুঃসময়ের পর উজ্জ্বল এক সকাল যেখানে সৌম্য সরকারের ব্যাটে আলো, রিশাদ হোসেনের স্পিনে ঘূর্ণিঝড়, আর দলের হাসিতে নতুন আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।
বাংলাদেশের ওয়ানডেতে সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড ১৮৩ রানের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২০১৮ সালে খুলনায়। এবার ব্যবধান মাত্র চার রানে কম, তবে তাৎপর্যে কম কিছু নয়।
২৯৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কখনোই ছন্দ খুঁজে পায়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্পিনারদের ঘূর্ণিতে একের পর এক ব্যাটার কেবল দিশেহারা। ৩০.১ ওভারে অলআউট ১১৭ রানে। সবকটি উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের স্পিনাররা।
নাসুম আহমেদ ও রিশাদ হোসেন নিয়েছেন তিনটি করে, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তানভীর ইসলাম পেয়েছেন দুটি করে উইকেট।
বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমান দলে থেকেও একটি বল পর্যন্ত করেননি বাংলাদেশের সব ৩০.১ ওভারই করেছেন স্পিনাররা। এ যেন স্পিন ঘূর্ণির এক অনন্য উদাহরণ।
এই জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন ওপেনার সৌম্য সরকার ও সাইফ হাসান। দুজনের ব্যাটে এসেছে অনবদ্য ছন্দ, এসেছে নিশ্চিত সূচনা।
উদ্বোধনী জুটিতে ১৭৬ রান তুলে বাংলাদেশকে শক্ত ভিত দিয়েছে এই জুটি। সৌম্য সরকার ৯১ রান করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যান, ৯ চার ও ৩ ছক্কার মারভরা ইনিংস।
দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলে ফিরে এই পারফরম্যান্স যেন তার নতুন প্রত্যাবর্তনের বার্তা।
সাইফ হাসানও ছিলেন দারুণ ছন্দে ৮০ রান করেন ৯৮ বলে, খেলেন অনবদ্য ড্রাইভ ও কাট শটের ফুলঝুরি।
এই জুটির পর নাজমুল হোসেন শান্ত (৪৪) ও তৌহিদ হৃদয় (২৮) ইনিংসটাকে টেনে নেন, তবে শেষ দিকে রান তোলার গতি ধরে রাখতে পারেনি দল।
৫০ ওভারে ২৯৬ রানে থামে বাংলাদেশের ইনিংস। শেষদিকে মেহেদী হাসান মিরাজের ১৭ ও তানভীর ইসলামের অপরাজিত ১৬ রান মোট যোগফলকে শক্তিশালী করে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে একমাত্র প্রতিরোধ আসে নিচের সারির ব্যাটার আকিল হোসেনের কাছ থেকে।
দশ নম্বরে নেমে ১৫ বলে ২৭ রান করেন তিনি। মিরাজের বলে বোল্ড হওয়ার আগে খারি পিয়েরকে নিয়ে শেষ উইকেটে ২০ রান যোগ করেন। সেই জুটিতে পিয়েরের অবদান শূন্য এটিই বোঝাতে যথেষ্ট, ব্যাটিং কেমন ছিল।
দলে শীর্ষ রান সংগ্রাহক ছিলেন আকিল, যা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যর্থতার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ পুরো ম্যাচটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে। শুরু থেকেই নাসুম আহমেদের নিখুঁত লাইন ও লেংথ, পরে রিশাদের বৈচিত্র্য, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি ঘূর্ণি—সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের পক্ষে একেবারেই দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি।
রিশাদের ফিগার ১০ ওভারে ৩/৫৪, তবে তার বোলিংয়ে ছিল ভয় জাগানো ধার। নাসুমের ৩/১১ যেন ছিল নিখুঁত এক স্পেল। মিরাজের অফস্পিনে পাওয়া দুটি উইকেট ম্যাচ শেষের ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। এ জয় শুধু সিরিজ জয়ের নয়, আত্মবিশ্বাস ফেরানোরও।
এই জয়ে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে দীর্ঘ সময়ের হতাশার অবসান ঘটাল বাংলাদেশ। টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ হারের পর অবশেষে জয়ের দেখা মিলল।
এর আগে সর্বশেষ সিরিজ জয় এসেছিল ২০২৪ সালের মার্চে, ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। তারপর আফগানিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা হার।
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ বললেন, ‘আমাদের এই জয়টা খুব দরকার ছিল। ছেলেরা একসঙ্গে পারফর্ম করেছে এটাই বড় পাওয়া। সিরিজ জেতা মানে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া।
সৌম্য সরকার পেলেন ম্যাচসেরা পুরস্কার। তার ব্যাটের দৃঢ়তায়ই দল পায় বড় ভিত্তি। আর পুরো সিরিজ জুড়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য ম্যান অব দ্য সিরিজ নির্বাচিত হয়েছেন তরুণ লেগস্পিনার রিশাদ হোসেন।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২–১ ব্যবধানে জিতে নিল বাংলাদেশ। এখন সামনে তিন ম্যাচের টি–টোয়েন্টি সিরিজ—২৭, ২৯ ও ৩১ অক্টোবর চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে হবে ম্যাচ তিনটি।
টাইগাররা চাইবে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। বিশেষ করে রিশাদ–নাসুম–মিরাজের স্পিন ত্রয়ীকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন কৌশল, আর সৌম্য–সাইফের ফর্ম নতুন আশার বার্তা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৫০ ওভার, ২৯৬/৮ (সৌম্য ৯১, সাইফ ৮০, শান্ত ৪৪, হৃদয় ২৮, মিরাজ ১৭, তানভীর ১৬, আকিল ৪/৪১, অ্যাথানেজ ২/৩৭)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৩০.১ ওভারে ১১৭ (আকিল ২৭, কিং ১৮, অ্যাথানেজ ১৫, কার্টি ১৫, গ্রিভস ১৫, নাসুম ৩/১১, রিশাদ ৩/৫৪, তানভীর ২/১৬, মিরাজ ২/৩৫)
ফলাফল: বাংলাদেশ ১৭৯ রানে জয়ী
সিরিজ: বাংলাদেশ ২–১ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সৌম্য সরকার ম্যান অব দ্য সিরিজ: রিশাদ হোসেন।
এই জয় কেবল সংখ্যার নয়, মানসিক মুক্তিরও। দীর্ঘ হারের হতাশা ভুলে নতুন করে শুরু করার প্রেরণা দিয়েছে টাইগারদের। স্পিনের দাপট, ওপেনিংয়ে স্থিতি, আর দলীয় সমন্বয় সব মিলিয়ে এ জয় বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন