বিশ্বকাপের সূচিতে ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান’ অক্ষ: ভারতকে চাপে ফেলার নতুন সমীকরণ

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
বিশ্বকাপের সূচিতে ‘বাংলাদেশ-পাকিস্তান’ অক্ষ: ভারতকে চাপে ফেলার নতুন সমীকরণ

মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিপিএলের দামামা বাজলেও ক্রিকেটপাড়ার মূল আলোচনা এখন অন্য জায়গায়। হাতে সময় মাত্র ১৯ দিন। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্দা উঠবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের। কিন্তু বাংলাদেশ দল কি শেষ পর্যন্ত বিমানে উঠবে? আর উঠলেও সেই বিমান কি ভারতের মাটিতে নামবে? এই প্রশ্নগুলোই এখন কোটি টাকার। বিশেষ করে, পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যখন বাংলাদেশের দাবির সমর্থনে নিজেদের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়েছে, তখন পরিস্থিতি কেবল খেলার মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে এক জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে।

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে এক অনন্য বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। বিসিবি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ভারত সফরে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি সাংবাদিক ও দর্শকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে দল পাঠাবে না। বিসিবির এই ‘সাহসী’ অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে পিসিবি।

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তান সরকার ও পিসিবি মনে করে বাংলাদেশের দাবি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। পাকিস্তান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বাংলাদেশের দাবি পূরণ না করে যদি এককভাবে ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয়, তবে পাকিস্তানও এই টুর্নামেন্টে না খেলার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, পিসিবির এই অবস্থান মূলত আইসিসিকে এটা বোঝানো যে—একসাথে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন করা মানে টুর্নামেন্টের ব্যবসায়িক মূল্যে বিশাল ধস নামা।

বাংলাদেশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে আইসিসির কাছে একটি ‘মধ্যপন্থা’ বা ‘হাইব্রিড মডেল’ প্রস্তাব করেছিল। বিসিবির প্রস্তাব ছিল—আয়ারল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের গ্রুপ অদলবদল করা।

বিসিবির পরিকল্পনা: বাংলাদেশকে ‘সি’ গ্রুপ থেকে সরিয়ে ‘বি’ গ্রুপে নেওয়া হোক এবং আয়ারল্যান্ডকে ‘সি’ গ্রুপে আনা হোক। এর ফলে বাংলাদেশের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত হবে এবং আয়ারল্যান্ড খেলবে ভারতে।

আইসিসির প্রতিক্রিয়া: সূত্র বলছে, আইসিসি এই প্রস্তাবে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। বরং তারা আয়ারল্যান্ডকে নিশ্চয়তা দিয়েছে যে গ্রুপ বদলানো হবে না। এমনকি আইসিসি বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে প্রস্তুত থাকার সংকেত দিয়ে রেখেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আইসিসির প্রতিনিধিরা কলকাতা ও মুম্বাইয়ে বাংলাদেশ দলের জন্য সর্বোচ্চ স্তরের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি দর্শকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিসিবির পাল্টা যুক্তি অত্যন্ত জোরালো—মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হলেও, গ্যালারিতে হাজার হাজার দর্শক এবং সংবাদকর্মীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া আইসিসি বা ভারত সরকারের পক্ষে বাস্তবে অসম্ভব। সাম্প্রতিক বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিসিবি কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ।

পাকিস্তানের এই হঠাৎ সমর্থনের পেছনে অনেকে ভারতবিরোধিতার ছায়াও দেখছেন। সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপে ভারত চ্যাম্পিয়ন হলেও পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারতীয় দল। এর প্রতিক্রিয়ায় নাকভি ট্রফিটি এখনো ভারতকে দেননি; তা দুবাইয়ের এসিসি কার্যালয়ে বাক্সবন্দী পড়ে আছে। এই চরম তিক্ততার জের ধরেই পাকিস্তান এখন বাংলাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভারতকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে ফেলতে চাইছে।

পাকিস্তানের জন্য বিশ্বকাপ বর্জন করা সহজ কথা নয়। আইসিসির রাজস্বের একটি বড় অংশ নির্ভর করে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর। যদি পাকিস্তান সরে দাঁড়ায়, তবে পিসিবি কয়েক মিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারাবে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তান যদি তাদের অবস্থানে অটল থাকে, তবে আইসিসি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। এটাই এখন বিসিবির শেষ ভরসা। যদি পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পাশে থাকে, তবে আইসিসি এবং বিসিসিআই হয়তো শেষ মুহূর্তে নমনীয় হতে বাধ্য হবে।

আগামী ২১ জানুয়ারি হতে যাচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেটের ভাগ্য নির্ধারণী দিন। ভারতের আধিপত্যের মুখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান কি নতুন কোনো ইতিহাস লিখবে, নাকি রাজস্ব আর নিষেধাজ্ঞার ভয়ে শেষ পর্যন্ত পিছু হটবে? ক্রিকেট বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ২১ জানুয়ারির দিকে। যদি আইসিসি নমনীয় না হয় এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একযোগে সরে দাঁড়ায়, তবে ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত টুর্নামেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এএন