মিরপুরের আকাশ তখন আতশবাজির আলোয় রঙিন, গ্যালারিতে হাজারো সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকার। হেলিকপ্টারে করে ট্রফি অবতরণ থেকে শুরু করে মাঠের লড়াই, সবকিছুই ছিল রূপকথার মতো। তবে সেই রূপকথাকে বাস্তবে রূপ দিলেন নাজমুল হোসেন শান্তর রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে পাত্তাই দেয়নি তারা। তানজিদ হাসানের অনবদ্য শতকের ওপর ভর করে ১৭৪ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর গড়ে রাজশাহী। জবাবে বিনুরা ফার্নান্দোর তোপে মাত্র ১১১ রানেই গুটিয়ে যায় চট্টগ্রামের ইনিংস।
ফাইনালের শুরুটা ছিল বেশ নাটকীয়। বিকেল সাড়ে চারটায় হেলিকপ্টারে করে ট্রফি নিয়ে মাঠে নামেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুই সফল অধিনায়ক আকবর আলী ও সালমা খাতুন। এরপর অভিনেত্রী তানজিন তিশার নাচের মাধ্যমে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠানের আমেজ। টসে জিতে চট্টগ্রাম রয়্যালস অধিনায়ক মেহেদী হাসান ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন।
রাজশাহীর ইনিংসের শুরুটা ছিল বেশ সতর্ক। ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান ও তানজিদ হাসান প্রথম ছয় ওভারে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৪০ রান যোগ করেন। তবে ধীরে ধীরে আগ্রাসী হয়ে ওঠেন তানজিদ। আমের জামাল ও মেহেদীদের ওপর চড়াও হয়ে একের পর এক ছক্কা হাঁকাতে থাকেন তিনি।
রাজশাহীর স্কোরবোর্ড সমৃদ্ধ করার পথে তানজিদ হাসান খেলেন ৬২ বলে ১০০ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস। তার এই ইনিংসে ছিল ৭টি বিশাল ছক্কা ও ৬টি চার। বিপিএল ফাইনালের ইতিহাসে ক্রিস গেইল ও তামিম ইকবালের পর তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। ফারহান ৩০ এবং কেইন উইলিয়ামসন ১৫ বলে ২৪ রান করে যোগ্য সঙ্গ দেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৭৪ রান সংগ্রহ করে রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
চট্টগ্রামের হয়ে মুকিদুল ও শরীফুল ২টি করে উইকেট নেন। বিশেষ করে শরীফুল ইসলাম এক আসরে ২৬ উইকেট নিয়ে বিপিএল ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের নতুন রেকর্ড গড়েন।
১৭৫ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই মহাবিপদে পড়ে চট্টগ্রাম রয়্যালস। লঙ্কান পেসার বিনুরা ফার্নান্দো ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই জোড়া আঘাত হানেন। মোহাম্মদ নাঈমকে বোল্ড করার পর মাহমুদুল হাসান জয়কে তানজিদের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন তিনি। ১৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা চট্টগ্রাম আর খেলায় ফিরতে পারেনি। মাঝের ওভারগুলোতে হাসান মুরাদ ও জিমি নিশাম চট্টগ্রামের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে দেন।
অধিনায়ক মেহেদী হাসান বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হন মাত্র ৮ রান করে। চট্টগ্রামের হয়ে একপ্রান্ত আগলে রাখা মির্জা তাহির বেগ ৩৯ রান করলেও তা পরাজয়ের ব্যবধান কমানো ছাড়া আর কোনো কাজে আসেনি।
বিনুরা ফার্নান্দো তার নির্ধারিত ওভারে মাত্র ৯ রান খরচ করে শিকার করেন ৪টি উইকেট। তাকে যোগ্য সহায়তা দেওয়া হাসান মুরাদ ১৫ রানে ৩ উইকেট এবং জিমি নিশাম ২৪ রানে ২ উইকেট নেন। শেষ পর্যন্ত ১৭.৫ ওভারে ১১১ রানেই শেষ হয় চট্টগ্রামের লড়াই।
আব্দুল গাফফারের করা ১৮তম ওভারের পঞ্চম বলে মুকিদুল ইসলাম আউট হতেই উল্লাসে মেতে ওঠে রাজশাহী শিবির। মাঠের চারপাশ থেকে কোচ, কর্মকর্তা ও খেলোয়াড়রা দৌড়ে আসেন মাঠের ভেতরে। ৬৩ রানের বিশাল জয় নিশ্চিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবে ভাসল লিগের নতুন ফ্র্যঞ্চাইজিটি।
রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ২০ ওভারে ১৭৪/৪ (তানজিদ ১০০, ফারহান ৩০, উইলিয়ামসন ২৪; মুকিদুল ২/২০, শরীফুল ২/৩৩)। চট্টগ্রাম রয়্যালস ১৭.৫ ওভারে ১১১/১০ (মির্জা ৩৯, আসিফ ২১, নেওয়াজ ১১; বিনুরা ৪/৯, মুরাদ ৩/১৫, নিশাম ২/২৪)। ফল হিসেবে রাজশাহী ওয়ারিয়রস ৬৩ রানে জয়ী হয়েছে। এবারের বিপিএল ফাইনাল অনেকগুলো রেকর্ডের সাক্ষী হয়ে রইল। তানজিদ হাসানের তৃতীয় বিপিএল সেঞ্চুরি তাকে দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে শীর্ষে নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, শরীফুল ইসলামের ২৬ উইকেট এক আসরে পেসারদের মধ্যে সর্বকালীন রেকর্ড। রাজশাহীর এই জয় কেবল একটি শিরোপা জয় নয়, বরং তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে একটি পরিকল্পিত ক্রিকেটীয় লড়াইয়ের ফসল। কেইন উইলিয়ামসন ও জিমি নিশামের মতো বিশ্বমানের তারকাদের উপস্থিতি এবং তানজিদ ও শান্তর মতো স্থানীয় ক্রিকেটারদের দায়িত্বশীলতা রাজশাহীকে এই শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন