আইসিসি বনাম দক্ষিণ এশিয়া

ক্রিকেট মানচিত্রে নতুন কূটনৈতিক যুদ্ধ, বয়কটের মুখে ২০২৬ বিশ্বকাপ

ক্রীড়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২৬, ০২:১২ পিএম
ক্রিকেট মানচিত্রে নতুন কূটনৈতিক যুদ্ধ, বয়কটের মুখে ২০২৬ বিশ্বকাপ

বাইশ গজের চিরচেনা লড়াই এখন মাঠ ছেড়ে ঢুকে পড়েছে সচিবালয় আর কূটনৈতিক টেবিলের রুদ্ধদ্বার কক্ষে। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হতে যখন বাকি মাত্র কয়েকটা দিন, তখন ক্রিকেট বিশ্বের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এক নজিরবিহীন বয়কট গুঞ্জনে। ভারতের মাটিতে পা না রাখার বিষয়ে বাংলাদেশের অনড় অবস্থানের পর এখন পাকিস্তানের প্রভাবশালী মহলের সরাসরি সমর্থন সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে। 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তিধর ক্রিকেটীয় দেশের এই একজোট হওয়া বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।

সংকটের মূলে নিরাপত্তা ও ভেন্যু বিতর্ক ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতের ভেন্যুগুলোতে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। বিসিবির দাবি ছিল, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের ওপর সুনির্দিষ্ট উগ্রবাদী হুমকি রয়েছে, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছিল তাদের গ্রুপের ম্যাচগুলো যেন বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু আইসিসির বোর্ড সভায় নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশের এই দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৪-২ ভোটের এই বিশাল ব্যবধানে হার প্রমাণ করে দেয় যে, ক্রিকেট বিশ্বের ক্ষমতা এখন একটি নির্দিষ্ট বলয়ের হাতে বন্দি। 

আইসিসি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ না এলে তাদের জায়গায় অন্য কোনো দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কণ্ঠেও ঝরেছে প্রতিরোধের সুর, তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো ট্রফি বা টুর্নামেন্টই খেলোয়াড়দের জীবনের চেয়ে বড় নয়।

পাকিস্তানের সংহতি, নাজাম শেঠির মাস্টারস্ট্রোক এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান। যদিও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা পিসিবি এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি, কিন্তু বোর্ডের সাবেক সফল চেয়ারম্যান নাজাম শেঠির বক্তব্য পরিস্থিতির গভীরতা বুঝিয়ে দিচ্ছে। নাজাম শেঠি সম্প্রতি টেলিকম এশিয়া স্পোর্ট এবং জিও সুপারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের এই অবস্থানকে ন্যায্য ও শক্তিশালী বলে অভিহিত করেছেন। 

নাজাম শেঠি কেবল প্রশংসাই করেননি, তিনি বর্তমান পিসিবি সভাপতি মহসিন নাকভিকেও একই পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মহসিন নাকভি যদি বাংলাদেশের সমর্থনে এই বিশ্বকাপ বয়কট করার মতো কঠিন কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, তবে আমি তাঁর পাশে থাকব। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফের মতো তারকারাও মনে করেন, ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যদি নিরাপদ না হন, তবে পাকিস্তানের জন্য সেখানে যাওয়া হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

আইসিসি বনাম ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল নাজাম শেঠির সবচেয়ে ধারালো আক্রমণটি ছিল খোদ আইসিসির বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ তুলেছেন যে, আইসিসি এখন আর কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়, বরং এটি ভারতের স্বার্থরক্ষাকারী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, প্রতিটি বিষয়ে ভারতের পক্ষ নেওয়া আইসিসির এখনই বন্ধ করা উচিত। 

অন্যান্য দেশগুলোর এখন একজোট হয়ে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। তবেই তারা বুঝতে পারবে যে এটি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল নয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আইসিসি যদি বাংলাদেশের যৌক্তিক নিরাপত্তা শঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তা ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে।

বয়কটের সম্ভাব্য ফলাফল, ক্রিকেট অর্থনীতির বিপর্যয় আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই আসরে যদি বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান, উভয় দেশই অনুপস্থিত থাকে, তবে তা হবে আইসিসির জন্য এক বাণিজ্যিক দুঃস্বপ্ন। প্রথমত, দর্শক ও ভিউয়ারশিপ। ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের যে বিপুল দর্শক চাহিদা থাকে, তা থেকে বঞ্চিত হবে সম্প্রচারকারীরা।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞাপনী আয়। বড় দুটি বাজার বাংলাদেশ ও পাকিস্তান হারিয়ে যাওয়ার ফলে টুর্নামেন্টের স্পনসরশিপ মূল্য নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক সংকট। ক্রিকেট ইতিহাসে এর আগে কখনো নিরাপত্তার কারণে দুটি বড় টেস্ট খেলুড়ে দেশ একসঙ্গে বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়নি।

একনজরে বর্তমান সংঘাতের চিত্র বর্তমান অবস্থানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ভারতে খেলবে না এবং ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তর চায়, কারণ খেলোয়াড়দের ওপর সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের সমর্থনে বয়কটের পথে হাঁটছে এবং তারা আঞ্চলিক সংহতি ও নিরাপত্তা শঙ্কাকে প্রধান যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে। 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বলছে ভেন্যু পরিবর্তন সম্ভব নয় এবং তারা বাণিজ্যিক চুক্তি ও অধিকাংশ সদস্যের ভোটের দোহাই দিচ্ছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই আইসিসির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল এবং তারা আয়োজক হিসেবে সব ধরনের নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে।

উপসংহার, বল এখন আইসিসির কোর্টে ক্রিকেট বিশ্বের বর্তমান এই অস্থিরতা কেবল একটি টুর্নামেন্ট কেন্দ্রিক নয়, বরং এটি বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহ। ৭ ফেব্রুয়ারি ঘনিয়ে আসছে।

যদি আইসিসি তাদের অবস্থানে নমনীয় না হয় এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্ত বজায় রাখে, তবে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় এক অসম্পূর্ণ ও কলঙ্কিত আসর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ক্রিকেট প্রেমীরা এখন ৭ ফেব্রুয়ারির সেই মুহূর্তটির অপেক্ষায়, যেখানে ঠিক হবে মাঠে লড়াই হবে ব্যাটে-বলের, নাকি কূটনৈতিক জেদের?

জেএইচাআর