মেসি-ট্রাম্প ঐতিহাসিক সাক্ষাতের আদ্যোপান্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
মেসি-ট্রাম্প ঐতিহাসিক সাক্ষাতের আদ্যোপান্ত

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হোয়াইট হাউস গতকাল এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী হলো। একদিকে বিশ্ব ফুটবলের অবিসংবাদিত সম্রাট লিওনেল মেসি, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

উপলক্ষটি ছিল ইন্টার মায়ামির প্রথম মেজর লিগ সকার বা এমএলএস কাপ জয়। ফুটবল আর রাজনীতির এই মিলনমেলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখে মেসির ভূয়সী প্রশংসা এখন বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার তুঙ্গে। 

বিশেষ করে ফুটবলের রাজা পেলের সঙ্গে মেসির তুলনা টেনে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছেন, তা নতুন করে এক বিতর্কের বা আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

শুক্রবার জানা যায় যে গত ডিসেম্বরে ইন্টার মায়ামি তাদের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ ঘরে তোলে। 

ডেভিড বেকহামের হাত ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা এই ক্লাবটি লিওনেল মেসির আগমনে আমূল পাল্টে যায়। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্লাবটির সকল সদস্যকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান। 

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোনো লিগ জিতলে হোয়াইট হাউস সফরের প্রথা থাকলেও, মেসির উপস্থিতিতে এবারের আয়োজনটি পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। আগামীকাল ওয়াশিংটন ডি সি ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে বর্তমানে ওয়াশিংটনেই অবস্থান করছে মায়ামি। ম্যাচের আগের দিনটিকে তাই এই রাজকীয় সাক্ষাতের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ট্রাম্প তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারন ট্রাম্পের ফুটবলের প্রতি অনুরাগের কথা তুলে ধরেন। তিনি বেশ হাস্যরসের ছলেই জানান, হোয়াইট হাউসে মেসির আগমনের খবরটি তিনি তাঁর ছেলের কাছ থেকেই প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে জানতে পারেন। 

ট্রাম্প বলেন যে তাঁর ছেলে ব্যারন তাঁকে এসে জিজ্ঞেস করল, বাবা তুমি কি জানো আজ কে আসছে? তিনি তখন কাজের চাপে ব্যস্ত ছিলেন, তাই খুব একটা খেয়াল করেননি। ব্যারন তখন বেশ উত্তেজনা নিয়ে বলল মেসি আসছে, সে তোমার অনেক বড় ভক্ত। ব্যারনের মতে, তুমি কেবল একজন বড় খেলোয়াড়ই নও, বরং এক অসাধারণ মানুষ। ট্রাম্প কেবল মেসির প্রশংসা করেই থেমে থাকেননি।

তিনি মেসির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নামও সম্মানের সাথে স্মরণ করেন। তিনি জানান, রোনালদো অসাধারণ, তবে মেসির ব্যক্তিত্ব এবং খেলার ধরন তাঁকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।

লিওনেল মেসি সম্প্রতি তাঁর ক্যারিয়ারের ৪৭তম শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়েছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে আর কারোর নেই। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে এই পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করে মেসিকে সম্মান জানান। 

তিনি বলেন, মেসি চাইলে বিশ্বের যেকোনো বড় ক্লাবে খেলতে পারতেন, কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইন্টার মায়ামিকে বেছে নিয়েছেন। আমেরিকার ফুটবলের প্রসারে মেসির এই অবদানকে ট্রাম্প অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। 

ট্রাম্পের মতে, মেসির এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি আসে যখন ট্রাম্প সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিতর্কে নিজের মতামত দেন। 

কিংবদন্তি পেলের খেলা সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা থেকে ট্রাম্প মেসির উদ্দেশে বলেন যে তিনি জানেন না এটা তাঁর বলা উচিত কি না, কারণ তিনি এখন প্রবীণ। তিনি নিজের চোখে পেলেকে খেলতে দেখেছেন। কিন্তু তোমাকে দেখার পর মনে হচ্ছে, তুমি হয়তো পেলের চেয়েও ভালো। অবশ্য পেলে যা ছিলেন তা অবিশ্বাস্য, কিন্তু তোমার জাদু অন্য পর্যায়ের।

ট্রাম্পের এই মন্তব্য সেখানে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে করতালির জোয়ার বইয়ে দেয়। যদিও ফুটবলের ভক্তরা সবসময়ই পেলে, ম্যারাডোনা ও মেসির মধ্যে কে সেরা তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত, কিন্তু খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে এমন স্বীকৃতি মেসির মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করল। 

হোয়াইট হাউসের এই অনুষ্ঠানে কেবল মেসিই নন, উপস্থিত ছিলেন লুইস সুয়ারেজ, তাদেও আলেন্দে এবং মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ রদ্রিগো দি পল। কোচিং স্টাফের পক্ষ থেকে মাচেরানোসহ ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 

আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ছিলেন মেজর লিগ সকারের কমিশনার ডন গারবার। এছাড়া হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্র গিলিয়ানি এবং সাবেক বেসবল লিজেন্ড অ্যালেক্স রদ্রিগেজও এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের অংশ ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শেষে একটি বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয় যখন মেসির হাতে একটি ফুটবল তুলে দেওয়া হয়। বলটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সাধারণত ভক্তরা মেসির অটোগ্রাফ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন, কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র দেখা গেল বিশ্বসেরা ফুটবলারের হাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর করা বল। 

রয়টার্সের ক্যামেরায় ধরা পড়া এই ছবিটি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। লিওনেল মেসি যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর থেকেই মেসি ম্যানিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের এই সফর প্রমাণ করল যে, মেসির প্রভাব কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এখন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মহলেও সমাদৃত। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পেলের সাথে মেসির তুলনা এবং ব্যারনের ভক্ত হওয়ার গল্পটি এই সফরকে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রাখবে। ইন্টার মায়ামি কেবল একটি ট্রফিই জেতেনি, তারা আমেরিকার মানুষের হৃদয়ে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।