আহমেদাবাদের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের গগণবিদারী চিৎকার। নীল জার্সি পরিহিত সমর্থকদের সেই উত্তাল সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে ভারত ঘোষণা করল তাদের আধিপত্যের নতুন অধ্যায়।
২০২৪ সালের পর ২০২৬, টানা দ্বিতীয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা নিজেদের শোকেসে তুলল ভারত। ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তেরঙ্গা ওড়াল সূর্যকুমার যাদবের দল।
ম্যাচের শুরুতেই টসে জিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার ভারতকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান। আহমেদাবাদের লাল ও কালো মাটির সংমিশ্রণে তৈরি পিচটি ছিল পুরোপুরি ব্যাটারদের স্বর্গরাজ্য। ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব টসের সময়ই পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন, টস জিতলে তিনিও আগে ব্যাটিংই বেছে নিতেন।
আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আড়াই শ রানের লক্ষ্য তাড়া করা প্রায় অসম্ভব, আর ভারত ঠিক সেই লক্ষ্যেই এগোতে শুরু করে। ইনিংসের শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে থাকেন দুই ওপেনার সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা। ম্যাট হেনরি এবং লকি ফার্গুসনের গতিকে কাজে লাগিয়ে মাঠের চারদিকে বাউন্ডারির ফুলঝুরি ছোটান তারা।
প্রথম ৬ ওভারে বিনা উইকেটে ৯২ রান সংগ্রহ করে ভারত, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাওয়ার প্লে-তে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। মাত্র ১৮ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করে অভিষেক শর্মা ২১ বলে ৫২ রান করে আউট হন।
অভিষেক আউট হলেও উইকেটের অন্য প্রান্তে থাকা সঞ্জু স্যামসন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। তিন নম্বরে নামা ঈশান কিষানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কিউই বোলারদের লাইন-লেন্থ এলোমেলো করে দেন। নিজের ইনিংসে ৮টি বিশাল ছক্কা মেরে সঞ্জু চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ছক্কা হাঁকানো ব্যাটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
৪৬ বলে ৮৯ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তিনি যখন প্যাভিলিয়নে ফিরছেন, ভারতের দুই শ রান তখন পার হয়ে গেছে। অন্য প্রান্তে ঈশান কিষান মাত্র ২৫ বলে ৫৪ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তাদের দুজনের ৪৮ বলে ১০৫ রানের জুটিতেই নিউজিল্যান্ড ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়।
ইনিংসের শেষ দিকে হার্দিক পান্ডিয়ার ১৩ বলে ১৮ এবং শেষ ওভারে শিবম দুবের বিধ্বংসী ব্যাটিং ভারতকে পৌঁছে দেয় রানের পাহাড়ে। জিমি নিশামের করা ২০তম ওভারে একাই ২৪ রান নেন দুবে। নির্ধারিত ২০ ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ২৫৫ রান, যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ।
২৫৬ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চাপে পড়ে নিউজিল্যান্ড। যদিও টিম সাইফার্ট এক প্রান্ত আগলে রেখে ২৩ বলে ঝড়ো ফিফটি তুলে নেন, কিন্তু অন্য প্রান্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে ব্ল্যাক ক্যাপসদের ব্যাটিং লাইনআপ। জাসপ্রিত বুমরা আবারও প্রমাণ করলেন কেন তিনি বিশ্বের সেরা বোলার।
গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জিমি নিশাম এবং ম্যাট হেনরিকে পর পর দুই বলে বোল্ড করে কিউইদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন তিনি। ৩.৪ ওভারে সামান্য রান দিয়ে তিনি শিকার করেন ৩ উইকেট। স্পিন জাদুকর বরুণ চক্রবর্তী টানা ২২টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে উইকেট পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ফিন অ্যালেন থেকে শুরু করে মার্ক চ্যাপম্যান, কেউই ভারতীয় স্পিন আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে পারেননি।
ম্যাচের ১১তম ওভারে কিছুটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে যখন অর্শদীপ সিংয়ের একটি থ্রো ড্যারিল মিচেলের পায়ে লাগে। তবে আম্পায়ারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হয়। ভারতের ফিল্ডিং ছিল দেখার মতো, বিশেষ করে ডিপ স্কয়ার লেগ অঞ্চলে ঈশান কিষানের ডাইভিং ক্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা। যখন নিউজিল্যান্ডের শেষ উইকেট জুটিতে কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল, অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ১৯তম ওভারে বল তুলে দেন অভিষেক শর্মার হাতে।
ওভারের শেষ বলে জ্যাকব ডাফিকে আউট করে নিউজিল্যান্ডকে ১৫৯ রানে গুটিয়ে দেন অভিষেক। ৯৬ রানের বিশাল জয়ে ভারত পায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তকমা। ভারতের পক্ষে সেরা পারফর্মার ছিলেন সঞ্জু স্যামসন ৮৯ রান, ঈশান কিষান ৫৪ রান ও অভিষেক শর্মা ৫২ রান। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে টিম সাইফার্ট ৫২ রান ও মিচেল স্যান্টনার ৪৩ রান করেন এবং ভারতের বুমরা ১৫ রানে ৩ উইকেট নেন।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের দুই ক্রিকেট আইকন মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মা। ট্রফি হাতে সূর্যকুমার যাদবের সেই হাসিমাখা মুখ মনে করিয়ে দিচ্ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের সোনালি যুগের কথা।
জয় শাহ এবং আইসিসি কর্মকর্তাদের হাত থেকে ট্রফি নেওয়ার পর পুরো আহমেদাবাদ আকাশ রাঙিয়ে দেয় আতশবাজির আলোয়। এই জয়টি কেবল একটি ট্রফি জয় নয়, এটি ভারতীয় ক্রিকেটের তারুণ্যের জয়। অভিষেক শর্মা, তিলক বর্মা এবং সঞ্জু স্যামসনদের মতো ক্রিকেটাররা প্রমাণ করেছেন যে সিনিয়রের অনুপস্থিতিতেও ভারত বিশ্ব শাসন করার ক্ষমতা রাখে।
অন্যদিকে, বোলিংয়ে বুমরার অভিজ্ঞতা আর বরুণ ও অক্ষরের স্পিন মিলে ভারতকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বানিয়েছে। ২০২৬ সালের ৮ মার্চের এই রাতটি ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নিউজিল্যান্ড আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ভারতের তৈরি করা রানের পাহাড় ডিঙানো তাদের জন্য ছিল হিমালয় জয়ের মতো কঠিন। শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট বিশ্বের সম্রাট হিসেবে ভারতই নিজের সিংহাসন ধরে রাখল।
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন