চলতি মৌসুমের শেষে লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন মিশরীয় ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহ। তার এই বিদায়ের ঘোষণায় অ্যানফিল্ডের সাবেক বস ইয়ুর্গেন ক্লপ সালাহকে 'সর্বকালের অন্যতম সেরা' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অ্যানফিল্ডে প্রথম পাঁচ মৌসুমে ক্লপের অধীনে সালাহ ১৫৬টি গোল করেছিলেন, জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, তিনটি ঘরোয়া কাপ, সুপার কাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ।
কিন্তু সালাহ কেবল একজন অসাধারণ ফুটবলারই নন, তিনি তার গণ্ডি পেরিয়ে লিভারপুল শহর, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, সমগ্র আফ্রিকা এবং মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অনন্য আইকন ও রোল মডেল হয়ে উঠেছেন।

সালাহ-র এই কিংবদন্তি হয়ে ওঠার যাত্রা কোনো জাদুবলে হয়নি; এর পেছনে রয়েছে চরম আত্মত্যাগ, অটল মানসিকতা এবং অবিশ্বাস্য স্তরের শৃঙ্খলা।
নাগরিগ থেকে কায়রো, ৯ ঘণ্টার সেই কঠিন সংগ্রাম
মিশরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম 'নাগরিগ'-এ জন্ম নেওয়া সালাহ-র শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। স্থানীয় ক্লাব 'আল মাকোলাউন আল আরব'-এর হয়ে যখন তিনি ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। অনুশীলনের জন্য তাকে প্রতিদিন বাসে করে কায়রো যাতায়াত করতে হতো। প্রতিদিন ৯ ঘণ্টার এই ক্লান্তিকর ভ্রমণ তার ভেতরের ফুটবলারকে শক্ত করে গড়ে তুলেছিল।
তবে সাফল্যের পথটি মসৃণ ছিল না। সালাহ তার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট স্মরণ করে 'স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড'-কে বলেন, আমি টানা দুই মাস সাইড বেঞ্চে বসা ছিলাম। একদিন কেঁদে ফেলে বাবাকে বললাম, 'আমি আর প্রতিদিন এভাবে গিয়ে বেঞ্চে বসে থাকতে পারব না।'

বাবা তখন বলেছিলেন, শোনো, ইতিহাসে যারা বড় নাম করতে পেরেছে, তাদের প্রত্যেককে প্রথমে প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে। এটা সহজ হবে না। শুধু মনোযোগ দাও, কঠোর পরিশ্রম করো, তুমি আবার খেলবে।' বাবার সেই কথা আমি আজও ভুলিনি। এর কিছুদিন পরেই আমি মূল দলে সুযোগ পাই এবং সবকিছু বদলে যায়।
ইউরোপে পাড়ি এবং ক্যারিয়ারের পুনর্গঠন
মিশরের ঘরোয়া ফুটবলে নিজের জাত চেনানোর পর সালাহ-র সামনে খোলে ইউরোপের দরজা। সুইজারল্যান্ডের সুপার লিগের ক্লাব এফসি বাসেল ,এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। মিশরের টেলিভিশন চ্যানেল 'কোল ইউম'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালাহ বলেন, যেদিন আমি বাসেলের ট্রায়ালের জন্য মিশর ছাড়ি, সেদিনই নিজেকে বলেছিলাম' আমাকে একজন সাধারণ খেলোয়াড় থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী কিছু হতে হবে। আমি বড় কিছু অর্জন করতে চেয়েছিলাম, যাতে মানুষ আমাকে ভালোবাসে ও অনুসরণ করে।
তবে ইউরোপের প্রথম দিকেই সাফল্য ধরা দেয়নি। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ ' না পেয়ে তার ক্যারিয়ার কিছুটা থমকে গিয়েছিল। নিজেকে প্রমাণ করতে তিনি ইতালির সিরি-এ লিগে পাড়ি জমান, প্রথমে ফিওরেন্টিনা এবং পরবর্তীতে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রোমার হয়ে দুর্দান্ত খেলেন।

এরপরই ২০১৭ সালে লিভারপুলের জার্সিতে পুনরায় ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করেন এই 'মিশরীয় রাজা'। অ্যানফিল্ডে নিজের প্রথম মৌসুমেই বিবিসি স্পোর্টসকে তিনি বলেছিলেন, পাঁচ বছর আগের আমি আর এখনকার আমির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত 'মানসিক এবং শারীরিকভাবে। আমি আমার পুরো জীবন ফুটবলের পেছনে বিলিয়ে দিয়েছি।
অ্যানফিল্ডের কোপ স্ট্যান্ডে 'মুসলিম' স্লোগান
২০১৭-১৮ মৌসুমে লিভারপুলের হয়ে সালাহ-র অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পর অ্যানফিল্ডের বিখ্যাত 'কোপ স্ট্যান্ড'-এ তাকে নিয়ে নতুন গান তৈরি হয় ,মো সালাহ, মো সালাহ, রানিং ডাউন দ্য উইং, সালাহ লা-লা-লা, দ্য ইজিপশিয়ান কিং!
সালাহ নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত এবং মাঠে গোল করার পর সিজদাহ দেওয়া তার চেনা উদযাপন।
তার এই ধর্মীয় নিষ্ঠা লিভারপুলের সমর্থকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, লন্ডনের ব্যান্ড ডজির 'গুড এনাফ' গানের সুরে তারা গাইতে শুরু করে, 'সে যদি তোমার জন্য যথেষ্ট ভালো হয়, তবে আমার জন্যও ভালো। সে যদি আরও কয়েকটা গোল দেয়, তবে আমিও মুসলিম হয়ে যাব! সে মসজিদে গিয়ে বসে, ওটাই আমার আসল ঠিকানা।

ম্যানচেস্টারের বিখ্যাত ব্যান্ড 'জেমস'-এর গায়ক টিম বুথ (যিনি নিজে লিডসের সমর্থক) সালাহ-র এই জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, আমাদের গান কেউ বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করুক তা আমরা চাই না। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন ফুটবলার যখন এত সুন্দর খেলেন, তখন তার নামে এই গান হওয়াটা আমাদের জন্য আনন্দের।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে সালাহ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম খেলোয়াড় হিসেবে ঘণ্টায় ৩৬.৬৪ কিলোমিটার গতি রেকর্ড করেছিলেন। তিনি একজন 'ইনভার্টেড উইঙ্গার' , যিনি ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ শুরু করে চোখের পলকে ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে তার শক্তিশালী বাম পা দিয়ে গোল করেন। তবে এই এক কৌশলে সীমাবদ্ধ না থেকে সালাহ কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের ডান পা-কেও সমান শক্তিশালী করে তুলেছেন।
'হাসপাতালের মতো বাড়ি': সালাহর রিকভারি সিক্রেট
মাঠে সালাহর ৯০ মিনিটের ম্যাজিকের পেছনে রয়েছে ঘরের ভেতরের এক কঠোর ও বৈজ্ঞানিক রুটিন। লিভারপুলের মাঠের অনুশীলন শেষে যখন অন্য খেলোয়াড়েরা বিশ্রাম নেন, সালাহ-র আসল কাজ তখন শুরু হয়। ইনজুরি এড়াতে এবং ক্লান্তি দূর করতে তিনি নিজের বাড়িতেই তৈরি করেছেন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত জিম ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। সালাহ নিজেই একবার বলেছিলেন, আমার বাড়িতে সব আছে, এটা দেখতে পুরো হাসপাতালের মতো।'
সালাহর দৈনিক রুটিনের প্রধান প্রধান দিকগুলো হলো:
হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বার: শরীরের ক্লান্তি দূর করতে এবং পেশির দ্রুত নিরাময়ের ' জন্য তিনি ঘরের এই বিশেষ চেম্বার ব্যবহার করেন।
আইস বাথ ও ক্রায়োথেরাপি: কঠোর ওয়ার্কআউটের পর পেশির প্রদাহ কমাতে প্রতিদিন বরফ শীতল পানিতে গোসল ' করেন।
যোগব্যায়াম ও পাইলেটস: শরীরের নমনীয়তা বাড়াতে এবং ইনজুরি প্রতিরোধে তিনি নিয়মিত ইয়োগা ও পাইলেটস করেন।
রান্নাঘর থেকে ফিটনেস' সালাহ-র ডায়েট চার্ট
ভালো অভ্যাস: জিমখানায় নয়, রান্নাঘরে তৈরি হয়, মেন ইন ব্লেজার্স মিডিয়া নেটওয়ার্ককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পুষ্টিগুণের গুরুত্ব বোঝাতে এই মন্তব্য করেছিলেন সালাহ। তিনি চিনি এবং গ্লুটেনযুক্ত খাবার থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকেন।

সালাহর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যা থাকে দিনে ৫ থেকে ৬ বার সুষম ও পরিমিত খাবার, প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন এবং সবুজ শাকসবজি (ব্রকলি, অ্যাভোকাডো), ওটস, মিষ্টি আলু, ডিম এবং বাদামের দুধ ও কার্বোহাইড্রেটের জন্য কেবল গ্লুটেন-মুক্ত বাদামী রুটি।
তবে এত কঠোর ডায়েটের মধ্যেও মিশরে ফিরলে সালাহ তার প্রিয় ঐতিহ্যবাহী জাতীয় খাবার 'কোশারি' (ভাত, ডাল, পাস্তা ও পেঁয়াজ বেরেশতার মিশ্রণ) খেতে ভুল করেন না।
মানসিক সুস্থতা ও দাবার চাল
শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমান প্রাধান্য দেন এই ফুটবল তারকা। প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর অথবা ঘুমাতে যাওয়ার আগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধ্যান বা মেডিটেশন করেন তিনি, যা তাকে লক্ষ্য স্থির রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া তিনি নিয়মিত দাবা খেলেন। সালাহ-র মতে, দাবা খেলার অভ্যাস মাঠে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মনোযোগ বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর।
মাঠের বাইরে এক অনন্য মানবহিতৈষী
মিশরের মানুষের কাছে সালাহ কেবল একজন ক্রীড়াবিদ নন, তিনি প্রতিটি সাধারণ শিশুর জন্য এক 'আশার প্রদীপ'। নিজের এই সামাজিক দায়িত্বের কথা সালাহ সবসময় মাথায় রাখেন। নিজ গ্রাম নাগরিগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন 'মোহাম্মদ সালাহ চ্যারিটি ফাউন্ডেশন'। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি এতিম শিশু, বিধবা নারী, দরিদ্র এবং অসুস্থ মানুষদের নিয়মিত আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেন।
যুক্তরাজ্যের লিভারপুল শহরেও সালাহ-র কারণে বর্ণবাদ ও ইসলামভীতি, উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলে বিভিন্ন সামাজিক গবেষণায় উঠে এসেছে। তার নম্রতা ও পেশাদারিত্ব অ্যানফিল্ডে মুসলিম সমর্থকদের উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যৎ গন্তব্য, ২০২৬ বিশ্বকাপ ও পরবর্তী অধ্যায়
৩৩ বছর বয়সী এই তারকার পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে ফুটবল বিশ্বে গুঞ্জন তুঙ্গে। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের ক্লাব আল-ইত্তিহাদ সালাহ-র জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রস্তাব দিয়েছিল, যা লিভারপুল তখন প্রত্যাখ্যান করে। তবে ২০২৬ সালে এসেও সৌদি প্রো লিগের শীর্ষ চার ক্লাব (আল-ইত্তিহাদ, আল-আহলি, আল-হিলাল ও আল-নাসর) তাকে দলে ভেড়াতে মরিয়া। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকার (MLS), তুরস্কের সুপার লিগ কিংবা পুনরায় ইতালিতে ফেরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সালাহর বড় স্বপ্ন মিশরের হয়ে 'আফ্রিকা কাপ অব নেশনস' জেতা এবং আগামী ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে মিশরকে নকআউট পর্বে নিয়ে যাওয়া। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৪ বছর। গতি ও শারীরিক তীব্রতার ওপর নির্ভরশীল তার খেলার শৈলী এই বয়সে কতটা ধরে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও সালাহ-র কঠোর পরিশ্রমী জীবনধারা যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।
তিনি যেখানেই যান না কেন, মার্সিসাইডের অ্যানফিল্ড থেকে শুরু করে নীল নদের তীর পর্যন্ত কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে মোহাম্মদ সালাহ চিরকাল রাজত্ব করবেন একজন খাঁটি 'মিশরীয় রাজা' হিসেবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন