কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প নিরাপত্তাহীনতায় বিপর্যস্ততার পথে

দে লো য়া র জা হি দ

আজকের বিশ্বে পর্যটকেরা যেখানেই যান না কেন সেখানে তারা অর্থপূর্ণ কোনো অভিজ্ঞতা খোঁজেন। তারা অবশ্যই ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া ঘেটে অনুসন্ধান করে দেখেন। এ ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার জন্য তাদের বাছাই করা এ গন্তব্য এর ব্র্যান্ড এবং আইকনিক অভিজ্ঞতা, আইনশৃঙ্খলা পরিষেবার খ্যাতি এবং গন্তব্যের পর্যটন পরিষেবা ইত্যাদি বিবেচনায় নেন। 

বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম একটি সমুদ্র সৈকত। এটি একটি বালুকাময় সৈকত যার দৈর্ঘ্য অবিচ্ছিন্ন ১৫৫ কিমি। কক্সবাজার শহরের প্রধান আকর্ষণ হলো এর সমুদ্র সৈকত। বাংলাদেশের কক্সবাজারে পর্যটক স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে সম্প্রতি গণধর্ষণের ঘটনায় চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গণধর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউই গ্রেপ্তার হয়নি।

যদিও অভিযুক্তরা পুলিশের তালিকায় নানা মামলায় জড়িত বলে জানা যায়। পর্যটক ধর্ষণে অভিযুক্তরা এখনো কক্সবাজার দাপায়ি বেড়াচ্ছে। তাদের সাথে পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যতার ও অভিযোগ উঠছে। দেশে খুন, গণ-ধর্ষণ  ও সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিকারবিহীন ভাবে বেড়ে চলছে। এরইমধ্যে পুলিশ গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় অনেক 'রহস্য' খুঁজে পাচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছে।  

কক্সবাজার নামের উৎপত্তি হয়েছে একজন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার, ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নাম থেকে, তিনি পালঙ্কি (আজকের কক্সবাজার) এর ফাঁড়ির সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। কক্সবাজার ১৬৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৬৯ সালে এটিকে পৌরসভা গঠন করা হয়। ৯ম শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের দ্বারা বিজয় না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজার সহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকায় আরাকান রাজার শাসনাধীন ছিল। 

মুঘল যুবরাজ শাহ সুজা আরাকানে যাওয়ার পথে বর্তমান কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে যান, তখন তিনি সেখানকার মনোরম ও মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে খুবই আকৃষ্ট হয়েছিলেন। যুবরাজ তার বাহিনীকে সেখানে ক্যাম্প করার নির্দেশ দেন। তার এক হাজার পালকি কিছু সময়ের জন্য সেখানে থেমে যায় ডুলাহাজারা নামক এ স্থানে, যার অর্থ "এক হাজার পালকি" এখনও এ স্থানটি  ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

বাংলাদেশের মতো যেকোনো দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অবদান রাখার মতো বহুমাত্রিক ক্ষমতা রয়েছে সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের। এখানকার পর্যটন শিল্পে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে, কিন্তু সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে সৃষ্টি হচ্ছে নানা প্রতিকূলতার। বিরাজমান সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখনও টেক-অফ পর্যায়ে রয়েছে। 

বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন নীতি প্রচারের জন্য পর্যটন শিল্পের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলিকে একটি ভাল অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করা দরকার, পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত বাধাগুলি নিয়ে ও আলোচনা করা দরকার  এবং দরকার ভবিষ্যতের নীতি প্রণয়নের পথ নিয়ে কর্ম্মকৌশল তৈরি করার।

বাংলাদেশের পর্যটন একটি ক্রমবর্ধমান শিল্প যা ২০১৯ সালে মোট জিডিপির ৪.৪% গ্রহণ করেছে (UNWTO ২০১৯)। এখানে সরকার বরাদ্দ দিয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা এফ.ওয়াই ২০১৯-২০ এতে. সিভিল এভিয়েশন (বিমান) এবং পর্যটনে যা বরাদ্দের দ্বিগুণেরও বেশি।  এছাড়াও ২০১৮ অর্থবছরে উল্লেখ করা হয় যে সরকার বাংলাদেশ পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। 

পর্যটন শিল্পের এ ব্যাপক উন্নতির পেছনে রয়েছে MSMEs দ্বারা চালিত (মাইক্রো, ছোট এবং মাঝারি উদ্যোগ), বিশেষ করে রেস্তোরাঁয়, আঞ্চলিক হোটেল, ট্যুর অপারেটর এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রম। এখনো সরকারি আর্থিক সহায়তা যেমন নগদ সুবিধা, আমদানিতে কর ছুটি এবং ভ্যাট অব্যাহতি ইত্যাদিতে পর্যটন খাত বর্তমানে কোনো সুবিধা উপভোগ করে না।

ঢাকা-কক্সবাজার রেল প্রকল্প: নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলার সাথে সাথে কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য উন্মুখ যাত্রী ও পর্যটকেরা আইন -শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে চরম উৎকণ্ঠায়।  

ঢাকা ট্রিবিউন এর এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, "প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। রেল সংযোগটি সম্পূর্ণ হলে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা থেকে নয়, বিদ্যমান ঢাকা-কলকাতা রেলপথের মাধ্যমে প্রতিবেশী ভুটান, ভারত ও নেপাল থেকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে তাদের দ্রুত ভ্রমণের সুবিধা দেবে। নির্মাণাধীন আখাউড়া-আগরতলা রেলপথের সঙ্গে রেল সংযোগ করা হবে।"

কক্সবাজার নগরীতে গড়ে উঠেছে বিপুল সংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউস, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। গড়ে উঠেছে অনেক আন্তর্জাতিক মানের ৩ থেকে ৫ তারকা হোটেল এবং রিসোর্ট, যা পর্যটকদের জন্য আনুষাঙ্গিক সুবিধা সহ একচেটিয়া সমুদ্র সৈকত দেখার সুযোগ। এটি সাঁতার কাটা, হাঁটা ও সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি অত্যাশ্চর্য এবং সুন্দর জায়গা। 

পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং পর্যটকদের  জন্য এবং আশ্চর্যজনক ও মনোরম প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য এটি একটি চমৎকার সৈকত যা বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালির সৈকতগুলির মধ্যে একটি। কক্সবাজারে সাম্প্রতিক আইন শৃঙ্খলার উদ্বেগ জনক পরিস্থিতির সুদূর প্রভাব পড়বে পর্যটন শিল্পে যেমনটি হয়েছিলো ভারতে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে পর্যটন অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই ভ্রমণকারীর ইচ্ছার সাথে অনুরণিত হতে হবে - ভ্রমণকারী দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে প্রয়োজন খাঁটি পর্যটন অভিজ্ঞতা যা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না. শিল্প  হিসেবে পর্যটন বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, সে অভিজ্ঞতা তৈরি এবং তা বাজারজাত করা। কক্সবাজারের ফ্রেমওয়ার্ক নতুন এবং বর্ধিত খাঁটি পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি এবং তা বাজারজাত করতে এর  সমস্ত অঞ্চলকে অপরাধের প্রতি শূন্য সহিষ্ণতার নীতির আওতায় আনতে হবে। 

কাঠামোর প্রাথমিক ধারণা হল যে কক্সবাজারের ফোকাস হবে ভ্রমণকারী/ভোক্তা। শিল্প নেতৃত্বের প্রচেষ্টা, সমর্থন জড়িত অনুঘটক পর্যটন সংস্থা, আমাদের পণ্য উন্নয়ন ও বিপণন প্রচেষ্টার সাথে সব ভ্রমণকারীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করা । অবশেষে, কক্সবাজারে পর্যটন শিল্পকে ত্বরান্বিত করতে অনুকূল অর্থনৈতিক বাহ্যিকতা ছাড়াও জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্ছ অগ্রাধিকার দিতে হবে তা না হলে এ উদীয়মান শিল্প বিপর্যস্ত হবে।

লেখক : দেলোয়ার জাহিদ, সাবেক রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা, (সেন্ট পলস কলেজ) কানাডা, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কানাডা ইউনিট কমান্ড নির্বাহী, প্রাবন্ধিক ও রেড ডিয়ার (আলবার্টা) নিবাসী।