সুপেয় পানিতেই পুরোপুরি তৃষ্ণা নিবারণ

  • বিশুদ্ধ পানি সব ধরনের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। সবার জন্য উন্নত উৎসের পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষের উন্নত উৎসের পানি পাওয়ার সুযোগ আছে, জানা যায় ২০১৩ সালের একটি জরিপে। তবে পুরোপুরি নিরাপদ পানি পানের সুযোগ এখনো সীমিত, যা মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে আর্সেনিকযুক্ত পানি পানকারীর হার ২৬ দশমিক ৬ থেকে কমে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এরপরও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে।

বাঙালির অস্তিত্বের সঙ্গে নদী কতটুকু জড়িয়ে আছে, নদী সভ্যতার বিকাশে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে কতটুকু অবদান রাখে, তা দেশের আর্থিক পরিসংখ্যান ও ইতিহাসের আলোকে খুব সহজেই বলা যায়। নদী বিশাল পানির উৎস এবং নদীবিধৌত পলিমাটির উর্বর কৃষিভূমি এ দেশের কৃষি উৎপাদনের মূল শক্তি। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। আর এ দেশে পানযোগ্য পানির প্রধান উৎস নদী-খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর ও জলাশয়। এক সময় আমাদের দেশে এক হাজারের বেশি নদী থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই এখন মরে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০-এ নেমে এসেছে। পানির অপর নাম জীবন। কথাটি চিরাচরিত হলেও সুপেয় পানি না হলে তৃষ্ণা নিবারণ পুরোপুরি মেটায় না। অথচ সুপেয় পানির জন্য এক সময় আমাদের দেশের নদী-নালা আর খাল-বিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার হতো।

বিশ্ব পানি দিবস আজ। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২২ মার্চ তারিখটিকে বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘পানি ও কর্মসংস্থান’। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনের-ইউএনসিইডি এজেন্ডা ২১-এ প্রথম বিশ্ব পানি দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রথম বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয় এবং তারপর থেকে এই দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো এই দিনটিকে নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে জাতিসংঘের জলসম্পদ সংক্রান্ত সুপারিশ ও উন্নয়ন প্রস্তাবগুলোর প্রতি মনোনিবেশের দিন হিসেবে উৎসর্গ করেন। প্রতি বছর বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার যেকোনো একটি বিশেষ কর্মসূচি পালন করে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও পরিচ্ছন্ন পানি ও পানিসম্পদ রক্ষা সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য এই দিন বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করে। ২০০৩, ২০০৬ ও ২০০৯ সালে জাতিসংঘ বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদন বিশ্ব পানি দিবসেই প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো— ‘পানির সহজ প্রাপ্তি, টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি’। পানি ও টেকসই উন্নয়ন এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে এবারের বিশ্ব পানি দিবস পালিত হচ্ছে। এই প্রতিপাদ্য অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, নিরাপদ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ কাজ করছে এবং এই কাজ করতে অন্যদেরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পানি শক্তির প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হবে এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। পানিসম্পদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দারিদ্র্যবিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের অন্যতম নিয়ামক। প্রকৃতি, কৃষি, শিল্প, খাদ্য, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, নগরায়ন ও নারীর সমতায়নে পানি অপরিহার্য। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা শহরের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৭০ মিটার নেমে গেছে। শিল্পকারখানা একদিকে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে অপরিশোধিতভাবে শিল্প বর্জ্য ফেলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।

বিশুদ্ধ পানি সব ধরনের মানবাধিকারের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। সবার জন্য উন্নত উৎসের পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ৯৭ শতাংশের বেশি মানুষের উন্নত উৎসের পানি পাওয়ার সুযোগ আছে, জানা যায় ২০১৩ সালের একটি জরিপে। তবে পুরোপুরি নিরাপদ পানি পানের সুযোগ এখনো সীমিত, যা মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে আর্সেনিকযুক্ত পানি পানকারীর হার ২৬ দশমিক ৬ থেকে কমে ১২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এরপরও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহ দূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে।

বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়। মলের জীবাণু রয়েছে এমন উৎসের পানি পান করছে ৪১ শতাংশের বেশি মানুষ। এক্ষেত্রে স্বল্প শিক্ষিত নগরবাসী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ২০১৩ সালের জরিপে বলা হয়েছে।

শহরাঞ্চলের এসব পরিবারে যে পানি খাওয়া হয় তার এক-তৃতীয়াংশেই উচ্চমাত্রার ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, উৎস থেকে বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের সময় এতে আরও বেশি ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া চলে যায়। প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি, অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে। আবার ঘরের কল বা টিউব-অয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯০ লাখ।

একটি জরিপে দেখা যায়, গত দশকে পানির ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। ২৪৮ কোটি মানুষ সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় নেই বললেই চলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, বেশির ভাগ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ লোকের দৈনিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন ৭ দশমিক ৫ লিটার পানি। মৌলিক চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য চাহিদা ও বিশুদ্ধ খাদ্য পানীয়ের জন্য প্রতিজনে ২০ লিটারের মতো পানি প্রয়োজন হতে পারে। পৃথিবীর শতকরা ৭১ ভাগ পানি হিসেবে থাকলেও এর মাত্র তিন ভাগ খাবার যোগ্য যার বিরাট অংশই এন্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে বরফ হিসেবে জমা আছে অথবা মাটির নিচে। হিসাব করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ০.০১ শতাংশ মানুষের ব্যবহারোপযোগী। তাও আবার পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। আধুনিক বিশ্বে যখন বিজ্ঞানের জয়-জয়কার সেখানে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য নাই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, আর প্রতি বছর শুধু পানিবাহিত রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ।

পানি আমাদের ন্যায্য অধিকারের একটি। সকলের জন্য পানি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পানি সংকট মোকাবিলা ও পানির জোগান নিশ্চিত করতে সকল প্রকার পানির উৎস নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয়ের দূষণ প্রতিরোধ ও ভরাট বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। ভরাট ও দূষণের কারণে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নির্ভরতা বেড়েছে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর। বর্তমানে দেশের ৯৮ ভাগ খাবার ও শুকনো মৌসুমে সেচ কাজে ৮০ ভাগ পানি ভূ-গর্ভস্থ থেকে সরবরাহ করা হয়। অনিয়ন্ত্রিত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন দুর্যোগ বয়ে আনবে। পানির উৎসসমূহ সংরক্ষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারই ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার হ্রাস করতে পারে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এর উৎসগুলো ভরাট ও দূষণমুক্ত করে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। জারে ভর্তি মিনারেল ওয়াটারের নামে খাওয়ানো হচ্ছে দূষিত পানি। রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশে বৈধ ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় ৩০০ কারখানায়ই উৎপাদন হচ্ছে দূষিত খাবার পানি। দু-একটি বাদে অধিকাংশ মিনারেল ওয়াটারের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে অপরিচ্ছন্ন স্থানে। রাজধানীর অনেক এলাকাতেই বর্তমানে পানির সংকট চলছে। অনেক এলাকায় পানি পাওয়া গেলেও তা দুর্গন্ধ ও ময়লা। সরাসরি ওয়াসার সাপ্লাই পানি পান করলে পেটের পীড়াসহ নানা অসুখ-বিসুখে ভুগতে হয়। আর এসব কারণেই সামর্থ্যবান মানুষ এখন বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য বেসরকারি খাতের মিনারেল ওয়াটারের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর সকল প্রাণেরই উৎস পানি এবং সকলেই পানির ওপর নির্ভরশীল।

পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ আজ খাদ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি যে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হচ্ছে সবার জন্য বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত নিরাপদ খাবার পানি। আর যেসব অঞ্চলে পানি স্বল্পতা সেসব অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে পানি যুদ্ধের সম্ভাবনা। যেমন- লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, তেমনি তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফেটিস নিয়ে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে গ্যালিলি সাগর নিয়ে। ইসরায়েল-ফিলিস্তান ও জর্দানের মধ্যে জর্দান নদী নিয়ে; সুদান, মিসর, ইথিওপিয়া ও আরও কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ নিয়ে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী নিয়ে; ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলম্যান্ড নদী নিয়ে আর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিবাদ তো আছেই। সেইসাথে তিস্তার পানিও আমাদের অন্যতম অধিকারের একটি।  তাই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, গবেষক

আমারসংবাদ/জেআই