স্বাধীনতা তুমি থাকবে চির অম্লান

  • ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। ব্রিটিশের পর পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ড। এ দেশকে দমিয়ে রাখার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে বাঙালিদের মাতৃভাষার ওপর। তাই পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তা রক্ষা ও সুসংহত করার জন্য আমাদের সকলের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে

স্বাধীনতা দিবস জাতীয় জীবনের গৌরব ও তাৎপর্যময় দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। এ দিনটি জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য, অগ্রগতি ও বিকাশের প্রতীক। তাইতো মার্চের প্রতিটি উত্তাল দিন বাঙালি জাতিকে জুগিয়েছে সাহস, করেছে আবেগী, দেশমাতাকে মুক্ত করার অনুপ্রেরণায় আপামর জনসাধারণের সে কি প্রচেষ্টা; সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছে। ২ মার্চ থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বহুল ঘটনা আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে স্মরণীয় হয়ে আছে। ২ মার্চ হরতাল চলাকালে কলাভবনের সামনে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়। ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয় পল্টন ময়দানে। এবং ঐ দিনই জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় সমবেত কণ্ঠে। মার্চের ৪ তারিখ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয়। সারা দেশে পুলিশবাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনগণের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হয়। চট্টগ্রামে ২ দিনে ১২০ জন নিহত এবং ৩৩৫ জন আহত হয়। খুলনায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ২২ জন আহত এবং ৬ জন নিহত হয়। এ রকমভাবে দেশের সব প্রান্তেই মুক্তিকামী জনগণের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের কারণেই দেশব্যাপী জনগণ মুক্তির স্বাদ নিতেই বঙ্গবন্ধু আহূত হরতালকে সর্বাত্মকভাবে পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অসাধারণ অধ্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ একটি সংগ্রাম, একটি ইতিহাস, বৈপ্লবিক অর্জন এবং সামষ্টিক বিজয়। বাঙালির জীবনে এর থেকে বড় অর্জন আর কখনই আসবে না। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ করে দিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। তাই সামাজিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঙালি জাতির এ মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং নেতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য দেশমাতার সন্তানরা তাদের নিজেদের জীবনকেও উৎসর্গ করতে পিছপা হয়নি। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন। ১৯৭১-এ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মধ্যে কিছু পাকিস্তানপন্থি রাজাকার, আলবদর, আলশামস ছাড়া অধিকাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক মুক্তিযুদ্ধে কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছেন। ফলে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালির মহান স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতার অর্জন তখনই অর্থবহ হবে যখন এর পেছনের কারিগরদের যথাযোগ্য মর্যাদায় উপযুক্ত আসনে অধিষ্ঠিত করা যাবে। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায়, একজন নারী মুক্তিসংগ্রামের ক্ষেত্রে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। তাই, মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা আলোকপাত করতে হলে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা প্রয়োজন।

২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাতের কথা এখনো বাঙালি জাতির জীবনে সংগ্রামের প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হয়।

কেননা, দুষ্কৃতকারীরা ষড়যন্ত্র করে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ দেশের প্রথিতযশা নাগরিকদের এ দেশি দোসরদের সহায়তায় হত্যা করে। তারপরও বাঙালিকে, বাঙালির সত্তাকে কোনোভাবেই ধ্বংস করতে পারেনি। চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বীর বাঙালি স্বাধীনতার সূর্যকে রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। হানাদাররা সে রাতেই বাঙালি বিবেকের জ্বলন্ত ভাস্বর, বিবেক ও অভিভাবক শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ভাষণ দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তি সংগ্রামের জন্য আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বীর বাঙালি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল বলেই দেশ অল্প সময়ে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। আলোচনার বিশ্লেষণে বলা যায়, মুক্তিসংগ্রামের পথিকৃৎ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ চিরভাস্বর। সেই সঙ্গে মার্চ মাস ছিলো বাঙালির আন্দোলনের সূতিকাগার স্বরূপ। কারণ, এ মাসেই মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ এবং সোনালি অর্জনগুলো এসেছে। এ মাসেই জাতির জনককে পাকিস্তানের কারাগারে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং গ্রেপ্তারের পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতা বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন আর সেই স্বাধীনতা প্রাপ্তির গোড়াপত্তন হয়েছিল মার্চ মাসেই। তাই, বাংলা এবং বাঙালির জীবনে মার্চ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অহঙ্কার। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সেই সোনার বাংলাদেশ এবং দিনে দিনেই এসে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের থেকে এদেশের জনগণ স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার ইস্যু নিয়ে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সেগুলোর মধ্যে কিছু তুলে ধরা যেতে পারে যেমন— ভূমিসংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি বা প্রশাসনের কার্যক্রমের মধ্যে দুই প্রদেশের অনেক বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নানা ধরনের সংশ্লিষ্ট বিষয়েই সংঘাত ঘটে। মূলত ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে থাকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা বলা যায়। বাঙালিরা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ক্ষমতায় গিয়েও পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলাকে শাসন করার অধিকার পায়নি। তখন পূর্ব বাংলার জনগণ মূলত ২১ দফা প্রণয়ন করেই জনগণকে সংঘবদ্ধ করে রাজনৈতিক আন্দোলনের চিন্তা-ভাবনা শুরু করে। আবার ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে আজকের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের সেই সামরিক এবং বেসামরিক নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের জননেতা- শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসাতেই যেন অস্বীকার করে। সুতরাং, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তার প্রতিবাদে ‘অসহযোগ আন্দোলনের ডাক’ দেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অর্থাৎ বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জন-সমুদ্রে ঘোষণা করেছিলেন— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তারই এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। এর পর ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে আবারো বঙ্গবন্ধু ‘স্বাধীনতার ডাক’ দিলেই বাংলার মুক্তিকামী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ ‘নয় মাস’ রক্ত ক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয়। অর্জিত বাংলার স্বাধীনতা। অপারেশন সার্চলাইট অনুযায়ী হানাদার পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কজন শিক্ষক-ছাত্র শহীদ হন। সারা ঢাকায় এক তাণ্ডবের সৃষ্টি হয়। সেদিনের সেই ছোট্ট রুনু, বয়স সাত অথবা আট হবে। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তার মনে আজও ভাসে সেই বীভৎস দিনের স্মৃতিকথা। কালরাত, চারদিক নিস্তব্ধ, থমথমে ভাব। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ। কানে তালা লাগার মতো। খাটের নিচে উপুর হয়ে শুয়ে থাকা। চারদিকে নিকষ অন্ধকার। থেমে থেমে গুলি বিনিময়। পাশাপাশি শুয়ে তবুও কারোর কথা যেন কানে যাচ্ছে না। প্রচণ্ড শব্দে কামানের গোলা, মর্টার শেলের আঘাত। কুণ্ডলী পাকানো ঘন ধোঁয়ার বলয় আকাশের দিকে ধাবমান। অন্ধকারে আগুনের স্ফূলিঙ্গ সে এক বুক কাঁপানো দৃশ্য। দাউদাউ আগুনে জ্বলে উঠলো রাজারবাগের পুলিশ ব্যারাক। তবুও নেতৃত্বহীন পুলিশ সদস্যরা পিছু হটেনি। থ্রি নট থ্রি রাইফেলে মুহুর্মুহু গুলিতে চালিয়ে গেছে প্রতিরোধ যুদ্ধ।

২৫ মার্চের সেই মর্মান্তিক গণহত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ দেশের অগুনতি মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বিজয় আমাদের ললাটে জোটে। বাংলাদেশ যেমন একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তেমনি স্বাধীনতা যুদ্ধও একদিনে শুরু কিংবা শেষ হয়নি। এর জন্য বিসর্জন দিতে হয়েছে তাজা প্রাণ। ত্যাগ করতে হয়েছে অনেক কিছু। এত ত্যাগ আর বিসর্জনের পর স্বাধীন যে বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে তাকে সমুন্নত রাখা আজ আমাদের একান্ত নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। ব্রিটিশের পর পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকদের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ড। এ দেশকে দমিয়ে রাখার জন্য তারা প্রথম আঘাত হানে বাঙালিদের মাতৃভাষার ওপর। তাই পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তা রক্ষা ও সুসংহত করার জন্য আমাদের সকলের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

আমারসংবাদ/জেআই