সহিংসতার শঙ্কায় ভোটগ্রহণ আজ

তৃতীয় ধাপে এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

সহিংসতার শঙ্কায় ভোটগ্রহণ আজ
তৃতীয় ধাপে ইউপির ভোটগ্রহণ আজ। একই দিনে দেশের ১০ পৌরসভায়ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনি সরঞ্জাম নিয়ে যান কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। ছবিটি বগুড়ার ধুনট উপজেলা পরিষদ এলাকা থেকে তোলা-আমার সংবাদ

আজ রোববার, দেশের এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তৃতীয় ধাপের এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে চার হাজার ৪০৯ জন, সংরক্ষিত সদস্য পদে ১১ হাজার ১০৫ জন ও সাধারণ সদস্য পদে ৩৪ হাজার ৬৩২ প্রার্থী ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

মোট ভোটারের সংখ্যা দুই কোটি ১৪ লাখ আট হাজার ২৭৮ জন। ভোটকেন্দ্র ১০ হাজার ১৫৯টি। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ইতোমধ্যে বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ৫৬৯ জন।

গত শুক্রবার রাত থেকেই সকল ধরনের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা বন্ধ। নির্বাচনি পরিবেশ রক্ষায় গতকাল রাত থেকেই টহল দিতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল রাতেই  প্রতিটি কেন্দ্রে নির্বাচনি সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। 

এদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের মতো সংঘর্ষ, গোলাগুলি, হামলা-পাল্টা হামলা, খুনোখুনি ও সহিংসতার শঙ্কা নিয়েই আজ সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদের তৃতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ হচ্ছে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠুু ও নিরপেক্ষ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও অসহযোগিতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালেট পেপার ছিনতাই, মুখোমুখি সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টা হামলা, স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মারধর, বিস্ফোরণ-গোলাগুলি ও ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। ওই দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে এ পর্যন্ত ২১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন দুই হাজার ৫৪৩ জন।

আর প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন। কঠোর অবস্থান ঘোষণার পরও ওই দুই ধাপে নির্বাচনি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি ইসি ও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনের মাঠের এমন চিত্রকে প্রহসনের নির্বাচন বলছে সুশীল সমাজ ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। 

তারা দাবি করেছিল— প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নির্বাচনের এমন পরিবেশের মাঝেই আজ ফের দেশের এক হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ফলে পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের এ ভোটেও উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে। যদিও নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখতে কঠোর অবস্থানে থাকবেন র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। একই সাথে মাঠে থাকবেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। 

এ জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি সব পক্ষের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্তা ব্যক্তিরা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নিজেদের করণীয় নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠক করছেন পুলিশ ও র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপিবিহীন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাঠে মুখোমুখি অবস্থানে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় দলটির দায়িত্বশীল নেতারা দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হচ্ছেন।

তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় সংঘাত, সহিংসতা, হানাহানি, মারপিট, গোলাগুলি, খুনোখুনি, হামলা-পাল্টা হামলা ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মূলত দলটির প্রভাবশালী নেতা ও প্রার্থীদের নিজেদের আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। 

এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে কঠোর অবস্থানে থাকার কথা ভাবছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন। 

আরও বৈঠক করছেন রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা। র‌্যাব কর্মকর্তারাও আলাদাভাবে বৈঠক করছেন। সামনের দিনগুলোয় যাতে আর প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কঠোর দৃষ্টি রাখছে পুলিশ ও র্যাব। মূলত চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও সরবরাহ বেড়েছে। ফলে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলটি ও তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং সমর্থকরা  রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়াচ্ছেন। 

তৃতীয় ধাপের তারিখ ঘোষণা ও প্রার্থী নির্ধারণ হওয়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহত হচ্ছেন অনেকে। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ হতে নির্বাচনি সহিংসতা হতে পার— বলেছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। 

তিনি বলেন, দেশব্যাপী প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর কয়েকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নির্বাচনি সহিংসতার খবর প্রচারিত হয়েছে। অনেক সময় ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা চালানোর অপচেষ্টা চালায়। এ কারণেও নির্বাচনের সময় অনেক ধরনের সহিংসতার উদ্ভব হয়। 

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনি সহিংসতার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নির্বাচন কমিশন চিঠি দিয়ে নির্বাচনি সহিংসতার বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্বাচনি কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশ এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা কমিশনকে অবহিত করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে। 

এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, ‘আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব নির্বাচনি সহিংসতা রোধ করার জন্য। সহিংসতা ঘটতে পারে এমন ‘পকেটগুলো’ চিহ্নিত করে আগাম গোয়েন্দা তথ্য নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ সেই সাথে নজরদারি বাড়ানো ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূক ব্যবস্থা নিতে বলেছে ইসি। 

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, যেসব সহিংসতা হচ্ছে তা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চেষ্টা করেও অনেক সময় তা ঠেকাতে পারছে না। এখানে কে দায়ী বা কার দায়দায়িত্ব সেটা বিষয় নয়। আমরা সহিংসতা ঠেকাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।