ডেঙ্গু শনাক্ত সূচক নিম্নমুখী

শীতের হাতছানিতে প্রকোপ কমছে ডেঙ্গুর। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর প্রবণতা বেশি থাকে। এ জন্য নগরজীবনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আঘাত হানে জুন থেকে। এ সময় মশার উপদ্রব অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। অক্টোবরে বৃষ্টির প্রবণতা কমতে শুরু করলে ডেঙ্গুও কমতে শুরু করে। দুই দশকেরও বেশি সময়ে দেশের ডেঙ্গু প্রবণতার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। 

সরকারি তথ্যমতে, প্রতি বছর ডেঙ্গু মৌসুমে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত-মৃত্যু ঘটে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রায় সাড়ে ২৭ হাজার রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। সম্প্রতি কোথাও নেই বৃষ্টি। আবদ্ধ পানি থেকে ডেঙ্গুর লার্ভা জন্মের ঝুঁকিও কমেছে। কিন্তু রাজধানী থেকে মশার উপদ্রব কমেনি। সন্ধ্যা নামার পর এক দণ্ড দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। ঘিরে ধরে মশা।

 কিন্তু দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মশকনিধনে নেই জোর তৎপরতা। অতিমারি করোনা সংক্রমণের মধ্যেও দেশে ডেঙ্গুতে ৯৮ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু অতিমারি রূপ নিয়েছিল। সে মৌসুমে লক্ষাধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আর আড়াই শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়। 

গেলো বছর পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও চলতি বছর ফের মাথাচাড়া দেয় ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ২০০০ সালে সর্বপ্রথম দেশে ডেঙ্গুজ্বর দেখা দেয়। সে বছর ৯৩ জন মারা যান। তিন বছর পর মৃত্যুসংখ্যা ধীরে ধীরে প্রায় শূন্যে নেমে আসে। তবে ২০১৮ সালে ডেঙ্গু আবার ফিরে আসে। সে বছর জ্বরটিতে ২৬ জন মারা যান এবং ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত হন।

২০১৮ সালের আগে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ২০০২ সালে। সে বছর সারা দেশে ছয় হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন। চলতি বছর দুই দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী আক্রান্ত হয়েছেন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত সাড়ে ২৭ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত ও ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাজধানীর টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার ও জনগণকে একসাথে কাজ করতে হবে। নয়তো রোগীর চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়। দুই সিটি কর্পোরেশনকে মশক নিধনের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠানও করা যেতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, গতকাল নতুন করে ৫৩ ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ২৪ এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৯ জন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ ডা. মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৫৩৬ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার মধ্যে সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ সাত হাজার ৮৪১ রোগী ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে সাত হাজার ৬৯৮ রোগী ভর্তি হয়েছেন। অক্টোবরে পাঁচ হাজার ৪৫৮, নভেম্বরে তিন হাজার ৫৬৭,  জুলাইয়ে দুই হাজার ২৮৬, জুনে ২৭২, মে মাসে ৪৩, এপ্রিলে তিনজন, মার্চে ১৩, ফেব্রুয়ারিতে ৯, জানুয়ারিতে ৩২ এবং চলতি মাসের গত চারদিনে ৩১৪ রোগী ভর্তি হন। এ পর্যন্ত ভর্তি  রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ২৭ হাজার ১৪৫ জন। ডেঙ্গুতে এ সময়ে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২৯৩ জন। তার মধ্যে ঢাকার ৪৬টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২১৩ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে আছেন ৮০ জন।

এদিকে মৃত্যু তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং চলতি মাসের গত চারদিনসহ এ পর্যন্ত ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে আগস্টে সর্বোচ্চ ৩৪, সেপ্টেম্বরে ২৩, জুলাইয়ে ১২, অক্টোবরে ২২ এবং নভেম্বরে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই ২৩ হাজার ১৬৫ ডেঙ্গু  রোগী ভর্তি হয়েছেন। মোট মৃতের ৯৮ জনের মধ্যে রাজধানীরই ৯০ জন। এদের মধ্যে ৫০ জন বেসরকারি হাসপাতালে ও ৪০ জন সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে মারা গেছেন। বাকি আটজন রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, জামালপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, বগুড়া, পটুয়াখালীতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে সিলেট বিভাগে এখনো কেউ মারা যাননি।

সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হয়েছে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখানে এ মৌসুমে সর্বোচ্চ ২১ জনের মৃত্যু হয়। ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৬, স্কয়ার হাসপাতালে আট, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে আট, ইবনে সিনা হাসপাতালে সাত, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়,  এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঁচ, ইউনাইটেড হাসপাতালে তিন, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন, হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে দুই, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই, সেন্ট্রাল হাসপাতালে দুই এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে একজন করে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। 

চলতি বছর শুধু ঢাকা শিশু হাসপাতালে এক হাজার ১২৬ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তার মধ্যে এক হাজার ১০৪ জন সুস্থ হলেও এখনো চিকিৎসা নিচ্ছে ছয় শিশু আর মৃত্যু হয়েছে আরও ১৬ জনের।