Amar Sangbad
ঢাকা শুক্রবার, ২০ মে, ২০২২, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছিল

জানুয়ারি ১, ২০২২, ০৮:৩৫ পিএম


বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছিল

দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বেশ কয়েকজন গুণী মানুষকে হারানোর বছর ছিল ২০২১। খ্যাতিমান এই শিল্পীদের পাশাপাশি শোবিজের অনেক তারকা তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছেন গেল বছর। সব মিলিয়ে বিষাদের এক কালো ছায়া নেমে এসেছিল গত বছর। ২০২১ সালের হারানো তারকাদের নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন—

রাবেয়া খাতুন: গত বছরের ৩ জানুয়ারি মারা যান একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখিকা রাবেয়া খাতুন।  অনেকদিন বাধ্যর্কজনিত রোগে ভুগে বনানীতে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে মামা বাড়িতে রাবেয়ার জন্ম। পৈতৃক ভিটা মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর গ্রামে। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বিদ্যালয়ের গণ্ডির পর তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত জীবনে সম্পাদক ও চিত্রপরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সাথে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয় ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই।তাদের চার সন্তানের মধ্যে রয়েছেন ফরিদুর রেজা সাগর, কেকা ফেরদৌসী, ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী। কর্মজীবনে রাবেয়া খাতুন রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মেঘের পর মেঘ’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র মেঘের পরে মেঘ। ২০১১ সালে তার আরেকটি উপন্যাস ‘মধুমতি’ অবলম্বনে পরিচালক শাহজাহান চৌধুরী একই শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা করেছেন।

ফকির আলমগীর:  গত বছরের ২৩ জুলাই মারা যান প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। গণসঙ্গীত ও দেশীয় পপ সঙ্গীতে ফকির আলমগীরের ব্যাপক অবদান। তিনি ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  বাবা মো. হাচেন উদ্দিন ফকির, মা বেগম হাবিবুন্নেসা। ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তিনি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে শিল্পী একজন শব্দসৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন।

এ টি এম শামসুজ্জামান: আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান (এটিএম শামসুজ্জামান) গেল বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মারা যান। পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে কয়েক মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার পর সূত্রাপুরের নিজ বাসভবনে নেয়া হলে সেখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বরেণ্য অভিনেতা ও কাহিনিকার। একজন অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এটিএম। অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননাসহ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ছয়বার।  এর মধ্যে দায়ী কে? (১৯৮৭) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে; ম্যাডাম ফুলি (১৯৯৯), চুড়িওয়ালা (২০০১) ও মন বসে না পড়ার টেবিলে (২০০৯) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ কৌতুকাভিনেতা বিভাগে এবং চোরাবালি (২০১২) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেতা বিভাগে পুরস্কার পান। ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আয়োজনে তিনি আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন নন্দিত এ অভিনেতা।

ড. ইনামুল হক : গুণী নাট্যকার ও অভিনেতা ড. ইনামুল হক ১১ অক্টোবর ঢাকায় মারা যান। ফেনীর এক মুসলিম পরিবারে ১৯৪৩ সালের ৭ মার্চ জন্ম ইনামুল হকের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে ১৯৬৫ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রসায়ন বিভাগে। ১৯৮৭ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন আন্দোলনমুখী নাটকে অংশ নেন ইনামুল হক।  ১৯৭০ সালে আইয়ুব খানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তৎকালীন অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন নাট্যচর্চাকে হাতিয়ার করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সৃজনীর ব্যানারে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ট্রাকে ট্রাকে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে পথনাটক করেন ইনামুল। তার ১৮টি নাটক বিভিন্ন নাট্যপত্র, বিশেষ ম্যাগাজিন এবং বই আকারে প্রকাশ হয়েছে। ইনামুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নির্জন সৈকতে, গৃহবাসী, মুক্তিযুদ্ধ নাটকসমগ্র। ড. ইনামুল হকের দাম্পত্যসঙ্গী বরেণ্য নাট্যজন লাকী ইনাম।

সারাহ বেগম কবরী: বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী মারা গেছেন গেল বছরের ১৭ এপ্রিল। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। চট্টগ্রামের মেয়ে কবরীর পারিবারিক নাম মিনা পাল। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় খ্যাতনামা এই অভিনেত্রী ও পরিচালকের। ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন ‘জলছবি’ ও ‘বাহানা’য়, ১৯৬৮ সালে ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আবির্ভাব’, ‘বাঁশরি’, ‘যে আগুনে পুড়ি’। ১৯৭০ সালে ‘দীপ নেভে নাই’, ‘দর্পচূর্ণ, ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘বিনিময়’ ছবিগুলোতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে তার অভিনয় দর্শকদের স্মৃতিতে এখনো অমলিন। ১৯৭৫ সালে চিত্রনায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ছবিতে অভিনয় করে ছাড়িয়ে যান আগের সব জনপ্রিয়তাকে। পরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। ষাট ও সত্তরের দশকের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা কবরী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মাহমুদ সাজ্জাদ: কলেজ জীবন থেকেই মঞ্চনাটকে যুক্ত ছিলেন মাহমুদ সাজ্জাদ। তারপর টেলিভিশন নাটকেও ব্যস্ততা বাড়িয়ে দেন। টেলিভিশনে তার অভিনীত প্রথম ধারাবাহিক ‘সকাল-সন্ধ্যা’। এরপর তিনি সহস্রাধিক নাটকে অভিনয় করে দর্শক মন জয় করেন। গেলো বছরের ২৪ অক্টোবর বেলা সাড়ে তিনটায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। উল্লেখ, জহির রায়হান পরিচালিত ‘সংসার’ সিনেমায় প্রথম অভিনয় করেন মাহমুদ সাজ্জাদ। পরে তিনি খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘ঝড়ের পাখি’, ‘আপন পর’, আজিজ আজহারের ‘চোখের জলে’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান।

মিতা হক: রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী মিতা হক গত বছরের ১১ এপ্রিল মারা যান। প্রথমে তিনি করোনাক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। সেখানে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও ক’দিন বাদে হার্ট অ্যাটাক হয় মিতা হকের। এরপর হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মিতা হকের জন্ম ঢাকায় ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর। তিনি প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খানের স্ত্রী। তার চাচা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও রবীন্দ্র গবেষক ওয়াহিদুল হক। মেয়ে জয়িতাও রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী। মিতা হক প্রথমে চাচা ওয়াহিদুল হক এবং পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান ও সন্জীদা খাতুনের কাছে গানের দীক্ষা নেন। সবমিলিয়ে প্রায় ২০০টি রবীন্দ্রসংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন গুণী এ শিল্পী। ভারত থেকে ১৪টি ও বাংলাদেশ থেকে ১০টি একক অ্যালবাম প্রকাশিত  তার। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৬ সালে শিল্পকলা এবং ২০২০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মিতা হক।  

শাহীন আলম: চিত্রনায়ক শাহীনূর আলম শাহীন (শাহীন আলম) মারা যান গত বছরের ৮ মার্চ। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও ডায়াবেটিস রোগে ভুগে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৫৮ বছর। মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে তার অভিনয়ে হাতেখড়ির পর ১৯৮৬ সালে এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানে চলচ্চিত্রে ডাক পান। ১৯৯১ সালে তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘মায়ের কান্না’। প্রায় দেড়শ ছবিতে অভিনয় করা শাহীন আলম শেষ জীবনে কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।