নৌকার দাঁড়ে বাঁধা জীবন

কনকনে শীতের সকাল। তখনো গভীর ঘুমে ঢাকা শহরের জনগণ। কিছু মানুষ গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে থাকলেও বেশির ভাগই চার দেয়ালের মাঝে বন্দি। ঘন কুয়াশায় ভারী কাপড় গায়ে জড়ালেও শীত যেন জেঁকে বসেছে। এদিকে মাথার উপরে খোলা আকাশ। গায়ে গরম কাপড় নেই। মাথায় নেই বালিশ। বিছানাও নেই অনেকের। 

প্রবাহমান নদীর সাথে নৌকার উপর ঘুমাচ্ছেন অনেকেই। অনেকেই আবার সারা রাতের পরিশ্রমের পরও জীবিকার তাগিদে ভোরের আলো জেগে ওঠার আগেই নিজে জেগে উঠেছেন। প্রচুর মশার প্রকোপে অনেকে মশারি ব্যবহার করছেন। ভাসমান নৌকার সাথেই যেন সারি সারি ওদের জীবন ভাসছে। প্রতিটি সকাল যেন শ্বাসরুদ্ধ অনিশ্চয়তা আর আলো-অন্ধকারের যোজন-বিয়োজন দিয়েই শুরু। বলছিলাম পুরান ঢাকার সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, বাদামতলী, মিটফোর্ড ঘাট, শ্যামবাজারসহ বিভিন্ন ঘাটে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এমন শত শত মাঝির কথা। 

প্রচণ্ড শীত বা গ্রীষ্ম অথবা ভারী বর্ষণে আবহাওয়া যাই হোক না কেন এমন অনিশ্চয়তায় দিনের পর দিন পার করছেন সদরঘাটের প্রায় দুই হাজারের বেশি মাঝি। নৌকায় তারা খাবার খান এই নৌকাতেই আবার অনায়াসেই রাতকে ভোর করে দিচ্ছেন। জীবন যেন তার নিজস্ব গতিতে দ্রুতই ছুটে চলছে কিন্তু এই দৌড় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে মাঝিরা। ভোরের অস্পষ্ট আলোয় বুড়িগঙ্গার বুকে ভাসিয়ে দেন নৌকা। 

দিন দিন তাদের উপার্জন কমছে। মুখে নেই হাসি, কণ্ঠে হতাশার সুর! তারপরও বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকা চালিয়ে এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন এই জীবনযোদ্ধারা। ইজারাদারের টাকা, নৌকার মালিকের টাকা, পাহারা  ও সিরিয়ালের টাকা— সব দাবি মিটিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, নৌকা চলে তো জীবন চলে না। 

জীবনযুদ্ধের হতাশা আর বাস্তবতার সরলরেখায় দাঁড়িয়ে এদের অনেকেই সন্তানদের পড়াশোনার টাকা যোগাচ্ছেন, অনেকে দু’বেলা খাবার তুলে দিচ্ছেন বৃদ্ধ বাবা-মা আর স্ত্রী-সন্তানদের মুখে। যান্ত্রিকতার এই যুগ আমাদের দিয়েছে অজস্র কিন্তু বিনিময়ে কম কিছু কেড়ে নেয়নি। হাতের  নাগালে সব তথ্য থাকে আজকাল। সব কিছু দেখা এবং চিন্তার খোরাক জোগালেও এদের নিয়ে ভাবার যেন কেউ নেই। থাকলেও তার সংখ্যা ঢের কম। 

এরফলে পর্দার আড়ালেই থেকে যান এরা। অনেকেই হতাশায়  একটা জীবন চোখ বন্ধ করে কাটিয়ে দেন। কেউবা হাঁটুর উপর তাল ঠুকে, দু’আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে উড়িয়ে দিতে চান জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্পগুলো। যে বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে ঘুরেছিল হাজারো মাঝির জীবিকার চাকা, সেই বুড়িগঙ্গা আজ হারাতে বসেছে তার যৌবন। দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে রমরমা কলকারখানা,  ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।  

পানি হয়েছে ব্যবহারের অনুপযোগী। আগে যে পানি দিয়ে গোসল করা যেত সেই পানি দেখলে এখন শরীর শিউরে ওঠে। আর যাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্বচ্ছ পানি হারিয়েছে তার প্রকৃত রূপ, সেই মাঝিদের পরিশ্রমেরও নেই মূল্যায়ন। সারা দিন নৌকা চালিয়ে এমনও হয়, দিন শেষে পকেটে কানাকড়িও থাকে না। ফলে ঢাকার যান্ত্রিক জীবনে মোমবাতির আলোর বিপরীতে সোডিয়াম আলো এলেও যুগ যুগ ধরে এ মাঝিদের জীবনে আসেনি পরিবর্তন।

বুড়িগঙ্গার ঢেউয়ের তালে তালে সারাদিন তারা যাত্রী নিয়ে এপার-ওপার করেন। দুভাবে যাত্রী পারাপার করে থাকেন এসব ঘাটের নৌকার মাঝিরা। দলগতভাবে ৮-১০ জন যাত্রী নিয়ে যেসব নৌকা যাত্রী পারাপার করে তারা প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে পাঁচ থেকে ১০ টাকা করে ভাড়া নেন। আর এককভাবে যে যাত্রী নৌকায় নদীর এপার থেকে ওপার যান তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় ২০-৩০ টাকা করে। যে প্রমত্তা বুড়িগঙ্গাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ঢাকা নগরী, চিরচেনা সেই বুড়িগঙ্গা আজ তার যৌবন-জৌলুস সব কিছুই হারিয়েছে কিছু প্রভাবশালী মানুষের লোভের কবলে পড়ে।

তারা দখল করেছেন এই নদীর  দুই তীর। নদী তীরে গড়ে তুলেছেন কলকারখানা। আর এসব কলকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলে দূষণ করছে নদীর পানি। তারপরও বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকা চালিয়ে এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে কিছু মানুষ।

সদরঘাটের মাঝিরা জানান, প্রতিদিন নৌকা ভাড়া ৭৫ টাকা। ঘাটের ইজারাদারের ভাড়া ৮৫ টাকা। রাতে নৌকা পাহারা ১০ টাকা। 

সিরিয়াল বাবদ পাঁচ টাকা। প্রতিদিন খাবারের পেছনে ২০০ টাকা দিয়ে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা থাকে। সব খরচ মিটিয়ে যা থাকে তা দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা অসম্ভব। তা ছাড়া আমাদের পরিবারগুলোও আমাদের মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকে। তাদের দেখতে হয়। 

অনেকের দুরারোগ্য ব্যাধিতে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছেন এ মাঝিরা। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, মাঝিদের জীবনমান উন্নয়নে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। নদীকেন্দ্রীক চাঁদাবাজি আর দখলদারিত্ব বন্ধ করতে না পারলে উন্নয়ন অসম্ভব। পাশাপাশি যে সব মাঝির বাসস্থান নেই তাদের জন্য সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করা অথবা প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় এনে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।