পার্কিং নিয়ে হার্ডলাইনে রাজউক

নাগরিকদের স্বার্থেই রাষ্ট্র চাইলেও অনেক সময় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয় অসচেতন নাগরিকদের জন্যই। দিনশেষে সরকারকে দায়ী করে বক্তব্যও দেয় সেসব নাগরিকরাই। নাগরিকদের স্বার্থে রাষ্ট্রের কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। যে সংস্থা সৃষ্টির পর থেকেই একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে। 

এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, রাজউক কর্তৃপক্ষ চাইলেও সুশৃঙ্খল ও গতিশীল রাখতে পারছে না কার্যক্রম। যার অন্যতম কারণ নাগরিকদের অসচেতনতা। সেসব নাগরিকরাই এখন গোটা রাজধানীজুড়ে পার্কিং সমস্যার চরম আকার ধারণ করিয়েছে। অসচেতন ও অর্থলোভী ভবন মালিকদের কেউ কেউ রাজউককে দেখিয়ে পার্কি রুমের ব্যবস্থা করেও পরবর্তীতে ব্যবহার করছে বাণিজ্যিকভাবে, আবার কেউ কেউ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না রেখে শুরু থেকেই রাজউকের চোখে ধুলো দিয়ে নির্মাণ করছে ভবন। এদের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানিও। 

তবে এবার আর সেসব ভবন মালিকদের ছাড় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজউক। এরই ধারাবহিকতায় ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে জেল-জরিমানাও দেয়া হচ্ছে বলে আমার সংবাদকে জানিয়েছেন রাজউকের চেয়ারম্যান (সচিব) এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী। 

জানতে চাইলে আমার সংবাদকে তিনি বলেন, যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা রাখার জন্য ভবন নির্মাণ প্ল্যান দেয়ার সময় ভবন মালিকদের আমরা বলে আসছি। ভবন নির্মাণের পরও তল্লাশি করে দেখছি, যথাযথ পার্কিং ব্যবস্থা আছে কী না। যদি এরপরও কেউ পার্কিং রুম অন্য কাজে ব্যবহার করে, সেক্ষেত্রে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালনা করছি। ভবিষ্যতে এ প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে।

গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, বিভিন্ন স্থানেই চরম পার্কিং সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাজউকের চোখে ধুলো দিয়েই এই সমস্যার প্রকট আকার ধারণ করিয়েছে অসাধু ভবন মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানিগুলো। পার্কিং ব্যবস্থা না করে ইতোমধ্যে অধিকাংশ বাড়িও নির্মাণ করা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে। যার ফলে রাজউকসহ বাড়িওয়ালাদেরই দুষছেন নগরবাসী। 

জানা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ ভবনেই নেই পার্কিং ব্যবস্থা, আবার যে কয়টির পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোরও অধিকাংশ স্থানে রুম স্থাপন করে ভাড়া দেয়া হচ্ছে অন্য কাজে। যে কারণে চরম পার্কিং সংকটে রয়েছে নগরবাসী। যেসব পার্কিংয়ে রুম স্থাপন করে ভাড়া দেয়া হচ্ছে সেসব বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে এতদিন মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হলেও এখন আর ছাড় দেয়া হবে  না উল্লেখ করে চেয়ারম্যান এবিএম আমিন নুরী রাজউকের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন গতকাল। 

জানা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ভবন নির্মাণ করার অন্যতম শর্ত পার্কিং স্থান রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে ভবনের পার্কিং স্থানে রুম বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন অধিকাংশ বাড়ি মালিক। যে কারণে এদের বিরুদ্ধে জোড়ালোভাবে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে রাজউক। রাজউক থেকে ভবনের কার পার্কিং স্থানে বসবাস না করার নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না অধিকাংশ বাড়ি মালিক। 

এ বিষয়ে অনেক আগেই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল রাজউক কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল ভবনের পার্কিং স্থানে বসবাস করা যাবে না। যারা পার্কিং স্থানে রুম করে ভাড়া দিচ্ছে তা অপসারণ করে পার্কিং স্থান বহাল না রাখলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু তাতেও শুধরাচ্ছে না ভবন মালিকরা। 

এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানও অনুমোদনের অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন নির্মাণ করছে বলেও অভিযোগ উঠছে। তবে নিয়ম অমান্য করে যারা এ ধরনের ভবন নির্মাণ করছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে রাজউক কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে একাধিক ভবন মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভবন মালিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে। 

রাজউকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নকশা অমান্য করে নির্মাণ করা ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হচ্ছে। রাজউকের বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযানে গেলে প্রভাব খাটিয়ে তা আটকে দেয়ার চেষ্টার পাশাপাশি আইনের আশ্রয়ও নিচ্ছেন অনেকে। বিধি অনুযায়ী এসব ক্ষেত্রে রাজউকের ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার থাকলেও তা রিট করে স্থগিত রাখার ঘটনাও ঘটছে। 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক বহুতল ভবন। এসব ভবনের পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও তাতে দেয়াল দিয়ে বসবাসসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে মালিকরা। অন্যদিকে নিয়ম অমান্য করেও নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন। যদিও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব রাজউকেরই।  

রাজউকের চেয়ারম্যান আরও বলেন, কোনো ভবনে রাজউকের অনুমোদনের বাইরে গিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করলে বা আবাসিকের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক হিসেবে ব্যবহার করলে সেগুলোয় আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছি। এটি আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ। আমরা যেখানেই অভিযোগ পাব সেখানেই অভিযান পরিচালনা করব। এ বিষয়েও আর কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।